‘নতুন’ কৌশলে এগোচ্ছেন ট্রাম্প, ইরানের বিরুদ্ধে এটি কতটা কার্যকর?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংঘাত ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর এটি নতুন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রায় এক মাসের বিরতির পর চলতি সপ্তাহে দুপক্ষের মধ্যে নতুন করে সরাসরি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে যুদ্ধের কৌশল বদলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ‘নতুন’ পর্বের সূচনা করতে যাচ্ছেন।
স্থানীয় সময় সোমবার (৩১ আগস্ট) ওয়াশিংটন ইরানের কৌশলগত লারাক দ্বীপে রকেট লাঞ্চার লক্ষ্য করে হামলা চালায়। জবাবে জর্ডানে অবস্থানরত মার্কিন বিমানঘাঁটিতে রাতারাতি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে তেহরান। এ ঘটনায় ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর কঠোর আঘাত হানব... এর জবাব দেওয়া হবে’।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে, দীর্ঘস্থায়ী পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে না জড়িয়ে পর্যায়ক্রমে ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক আঘাত হানা- এমন এক ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ কৌশলে এগোচ্ছে ওয়াশিংটন। তবে এ ধরনের অনিয়মিত সংঘাতের ওপর ভর করে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত কতটুকু টেকসই হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতে টানা ৪০ দিনের তীব্র সামরিক অভিযানের পর এপ্রিলে প্রথম যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। পরবর্তীতে জুন মাসে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ৬০ দিনের শান্তি আলোচনার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। তবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ কার থাকবে- এই অস্পষ্টতাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের দোষারোপের মধ্যে তা ভেস্তে যায়।
জুলাই মাসে পুনর্নবীকরণ হওয়া পাল্টাপাল্টি হামলার পর সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন গতিপথ কিছুটা বদলে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগে মনোযোগ দিয়েছে। এর অন্যতম কারণ মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসা সংক্রান্ত বিভিন্ন রিপোর্ট, যদিও হোয়াইট হাউস তা অস্বীকার করে আসছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট তেল খাতসহ ইরানের আর্থিক স্বার্থকে লক্ষ্য করে ৬০টি প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র সমাধান খোঁজার পরিবর্তে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অস্থিতিশীল মধ্যবর্তী অবস্থাকে বেছে নিচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট’-এর পরিচালক ত্রিতা পারসি মনে করেন, একটি দেশের ওপর পর্যায়ক্রমে ড্রোন বা বিমান হামলা চালানো মানে মূলত চিরস্থায়ী যুদ্ধ টিকিয়ে রাখা। ট্রাম্প প্রশাসন সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান করতে না পেরে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের কৌশল নিয়েছে।
তাছাড়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি জাহাজ চলাচল করত, তা এখন গড়ে মাত্র সাতটিতে নেমেছে।
রাজনৈতিক ও সামরিক সীমাবদ্ধতা
বিশ্লেষকদের অভিমত, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি এমন অভিযান ধরে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে সহজ হবে না। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ এসলামির মতে, ওয়াশিংটন আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ইরানের ওপর চাপ ধরে রেখে অপেক্ষা করতে চায়।
কিন্তু দেশের ভেতরে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও অন্তহীন যুদ্ধের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বর্তমানে ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া তেলআবিব ও ওয়াশিংটনের কৌশলগত অগ্রাধিকার ভিন্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে; নেতানিয়াহু যেখানে যেকোনো মূল্যে তেহরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে চান, সেখানে ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য নভেম্বরের নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক ক্ষতি সামলে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজা।
আন্তর্জাতিক পলিসি বিশ্লেষক নেগার মোর্তাজাভি সতর্ক করে জানান, তেহরান শুধু অর্থনৈতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। ওয়াশিংটন যদি জুনের সমঝোতা স্মারকে ফিরে না আসে, তবে এই অস্থিতিশীল লড়াই যেকোনো সময় অনিয়ন্ত্রিত ও একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক