ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী-সন্তানসহ গাড়ি খাদে ফেলেও আইনি মুক্তি চিকিৎসকের
নিজের স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ বিলাসবহুল টেসলা গাড়িটি ২৫০ ফুট গভীর গিরিখাদে ফেলে দেওয়ার পরও সব ধরনের আইনি অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পেয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত চিকিৎসক ধর্মেশ প্যাটেল (৪৫)। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আদালত তার বিরুদ্ধে আনা হত্যাচেষ্টার মামলা পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছেন। সপরিবারে আত্মহননের মতো এমন ভয়ঙ্কর অপরাধের পরও কেন এই চিকিৎসক আইনি খালাস পেলেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে কৌতূহল। খবর এনডিটিভির।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও মার্কিন আদালতের আইনি ধারা পর্যালোচনায় এই মুক্তির মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ক্যালিফোর্নিয়ার বিশেষ ‘মানসিক স্বাস্থ্য আইন’ এবং ওই চিকিৎসকের তৎকালীন চরম মানসিক বিকৃতি।
আরও পড়ুন : হামলার জবাবে ৮৫ মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের পাল্টা আঘাত
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার আইন অনুযায়ী, কোনো অপরাধী যদি গুরুতর মানসিক অসুস্থতার কারণে অপরাধ সংগঠন করে থাকে, তবে তাকে প্রচলিত কারাগারের শাস্তির বদলে ‘মেন্টাল হেলথ ডাইভারশন’ বা মানসিক স্বাস্থ্য পুনর্বাসন কর্মসূচিতে পাঠানোর বিধান রয়েছে। ৪৫ বছর বয়সী ধর্মেশ প্যাটেল আদালতের নির্দেশে গত দুই বছর ধরে এই বিশেষ চিকিৎসাপদ্ধতি ও পুনর্বাসন কর্মসূচি অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।
সান মাতেও কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি স্টিভ ওয়াগস্টাফ সংবাদ সংস্থা এপিকে জানান, আইন অনুযায়ী বিচারক এই মামলাগুলো খারিজ করতে বাধ্য ছিলেন। কারণ এই ডাইভারশন আইনের নিয়মই হলো, কোনো ব্যক্তি যদি তার জন্য নির্ধারিত সম্পূর্ণ চিকিৎসা পরিকল্পনা সঠিকভাবে মেনে চলে, তবে দুই বছর পর তার অপরাধের রেকর্ড সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়।
তদন্তে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২ জানুয়ারি উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার একটি পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ধর্মেশ প্যাটেল তার স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ সাদা রঙের টেসলা গাড়িটি পাহাড়ের ২৫০ ফুট গভীর খাদে নামিয়ে দেন। অত বড় দুর্ঘটনা সত্ত্বেও অলৌকিকভাবে গাড়ির চার আরোহীই বেঁচে যান। ঘটনার পর ধর্মেশের স্ত্রী পুলিশকে জানান, তার স্বামী ইচ্ছাকৃতভাবেই গাড়িটি খাদে ফেলেছিলেন।
আরও পড়ুন : ইরাকে পৌঁছাল খামেনির মরদেহ, জানাজায় জনসমুদ্র
পরবর্তী সময়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের জেরার মুখে এই অপরাধের পেছনের আসল কারণ জবানবন্দি দেন ধর্মেশ। তিনি জানান, ঘটনার সময় তিনি তীব্র বিষণ্নতা বা ‘মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডারে’ ভুগছিলেন। সে সময় তার মাথায় এক অদ্ভুত ভীতি ও ভ্রম চেপে বসেছিল যে, তার ৪ ও ৭ বছর বয়সী সন্তান দুটিকে কোনো ভয়ঙ্কর মানবপাচারকারী চক্র অপহরণ করে নিয়ে যাবে। সন্তানদের সেই কাল্পনিক ও নির্মম নির্যাতন থেকে ‘রক্ষা করতে’ এবং নিজের চোখের সামনে থেকে হারিয়ে যাওয়া আটকাতেই তিনি সপরিবারে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
কারাগারে এক বছর কাটানোর পর ২০২৪ সালে চিকিৎসকদের রিপোর্টের ভিত্তিতে আদালত তাকে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি দিয়ে একটি আউটপেশেন্ট মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে পাঠায়। ক্যালিফোর্নিয়ার মেডিকেল বোর্ড তার লাইসেন্স বাতিল করলেও আদালত তার চিকিৎসার স্বার্থে কিছু শিথিলতা আনে। জামিনে থাকাকালীন ধর্মেশকে পায়ে জিপিএস ট্র্যাকিং ব্রেসলেট পরে থাকতে হতো। প্রতি সপ্তাহে আদালতে হাজিরা দিতে হতো। একই সঙ্গে তার পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সও জব্দ ছিল।
পরবর্তী সময়ে ধর্মেশ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলে তার স্ত্রীও তার বিরুদ্ধে মামলা চালাতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি সন্তানদের নিয়ে ধর্মেশের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। আদালতও তাকে পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক সময় কাটানোর অনুমতি দেয়। অবশেষে দুই বছরের নিবিড় মানসিক চিকিৎসা সফলভাবে শেষ হওয়ার প্রমাণ মেলায় মার্কিন আদালতের নিয়মানুযায়ী তিনি সব ধরনের ফৌজদারি দায় থেকে চিরতরে মুক্তি পেলেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক