জেরুজালেমে খ্রিস্টানদেরও মারছে ইহুদিরা, দিচ্ছে থুতু
সকালের সোনালী রোদ এসে পড়েছে জেরুজালেমের ওল্ড সিটির প্রাচীন পাথুরে দেওয়ালে। প্রতিদিনের মতো নিজের মঠ থেকে বেরিয়েছেন ফাদার নিকোডেমোস শ্নাবেল। কিন্তু পবিত্র শহরের চেনা রাস্তায় পা রাখতেই এক আতঙ্ক গ্রাস করল তাকে। কিছুদূর যেতেই এক উগ্রপন্থি ইহুদি তরুণ তার দিকে তাকিয়ে অবমাননাকর গালি দিতে দিতে ছুড়ল থুতু। একটু এগিয়ে যেতেই দেখা গেল আরও নির্মম দৃশ্য। স্বয়ং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরিহিত এক সেনাসদস্য নির্দ্বিধায় থুতু ছুড়লেন এই খ্রিস্টান যাজকের গায়ে। খবর ডয়েচে ভেলের।
কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়, কোনো গোপন অন্ধকার গলিও নয়; খোদ যিশু খ্রিস্টের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র নগরী জেরুজালেমেই এখন প্রতিদিন এভাবে লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে খ্রিস্টানরা। সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, দিনের আলোয় এক খ্রিস্টান নােনর (সন্ন্যাসিনী) ওপর চড়াও হয়েছে উগ্রপন্থীরা। স্থানীয় খ্রিস্টানদের মতে, গণমাধ্যমে যেসব খবর আসছে, তা আসলে প্রকৃত পরিস্থিতির ‘হিমশৈলের চূড়ামাত্র’।
জেরুজালেমের খ্রিস্টান কোয়ার্টারে এখন দিন কাটে এক অজানা আতঙ্কে। কেন এই আকস্মিক ঘৃণা? এর নেপথ্যে রয়েছে ধর্মীয় অন্ধত্ব আর উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপজ্জনক ককটেল। কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের একটি অংশ মনে করে, এই পবিত্র ভূমিতে ইহুদি ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের মানুষের টিকে থাকার অধিকার নেই।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই ঘৃণ্য আচরণকে রাষ্ট্রীয়ভাবে একপ্রকার প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। ইসরায়েলের বর্তমান অতি-ডানপন্থি সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গ্যভিরের মতো উগ্রপন্থি নেতারা এই হামলাগুলোকে কেবল ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাই করেননি, বরং অতীতে একে একপ্রকার জায়েজও করেছেন। তার দাবি, কোনো গির্জা বা খ্রিস্টান যাজকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় থুতু ফেলা নাকি একটি ‘প্রাচীন ইহুদি ঐতিহ্য’! মন্ত্রীর এমন প্ররোচনামূলক মন্তব্যের পর উগ্রপন্থীরা এখন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আগে যা ঘটত জনশূন্য বা নির্জন স্থােন, তা এখন ঘটছে প্রকাশ্য দিবালোকে।
জেরুজালেম সেন্টার ফর জিউইশ-ক্রিশ্চিয়ান রিলেশনেসর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হানা বেন্ডকোস্কি জানান, সাধারণ ইসরায়েলিদের বড় অংশ এই হামলাগুলোকে গুরুতর অপরাধ মনে করলেও, দেশটির সরকার, মেয়র কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে এ নিয়ে কঠোর কোনো পদক্ষেপ বা নিন্দা দেখা যাচ্ছে না। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই অনীহা ও শিথিলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পরিচালিত একটি জরিপের তথ্য উল্লেখ করে বেন্ডকোস্কি জানান, মাত্র ৪ শতাংশ ইসরায়েলি এই ধরনের হামলা সমর্থন করে। সংখ্যাটি খুব কম হলেও এর সামাজিক প্রভাব অনেক গভীর, কারণ এর ফলে পুরো খ্রিস্টান সমাজ নিজেদের নিজ ভূমিতেই অবাঞ্ছিত ও অনিরাপদ মনে করছে।
‘আমরা বড্ড একা, আমাদের কেউ নেই’
খ্রিস্টান কোয়ার্টারের কয়েকজন বাসিন্দা বলছিলেন, আমরা বড্ড একা। কোনো মেয়ে বিপদে পড়লে এখানে কেউ এগিয়ে আসবে না। কোনো সমাধান নেই, কোনো আশাও নেই। আমাদের একমাত্র প্রার্থনা, সন্তানরা যেন ভালো শিক্ষা পেয়ে কোনোমতে এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারে।
যে জেরুজালেম একসময় ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম- তিন ধর্মের মানুষের সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জন্য গর্ব করত, সেই সোনালী দিন যেন আজ ফিকে হয়ে গেছে। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, জেরুজালেমে বসবাসরত ৪৫ বছরের কম বয়সী খ্রিস্টানদের প্রায় অর্ধেকই এখন চিরতরে এই পবিত্র ভূমি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক