হারলেন মমতা, ডুবল তৃণমূলও
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় পালাবদল হচ্ছে। দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার নির্বাচনে হোঁচট খেয়েছেন। নিজ আসন ভবানীপুরে তো হেরেছেনই, প্রাথমিক ফলাফলে তার নেতৃত্বাধীন অল ইন্ডিয়া তুণমূল কংগ্রেসেরও এবার ভরাডুবি হয়েছে। প্রাথমিক ফলাফলে ২৯৪ আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ২০৬ আসন আর তৃণমূল মাত্র ৮১টি আসন। এই ফল শুধু একটি নির্বাচনি পরাজয় নয়- বরং রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের সূচনা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভবানীপুরের ঘরের মেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অথচ সেই নিজের ঘরেই হারতে হয়েছে তৃণমূলনেত্রীকে। পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েছিলেন মমতা। সে সময়ও হেরেছিলেন তিনি। এবার মমতার আসনেই লড়াইয়ে নেমে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন বিরোধী দলের নেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাতেও হারতে হলো তৃণমূলনেত্রীকে। ঘরের মেয়েকে হারতে হল ঘরেই।
নিজের আসন ভবানীপুরকে ‘বড়বোন’ ও নন্দীগ্রামকে ‘মেজোবোন’ বলে সম্বোধন করতেন মমতা। ‘মেজবোনের’ কাছে পাঁচ বছর আগেই হেরেছিলেন। সে বারও হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। এবার ‘বড়বোন’ ভবানীপুরেও হারলেন তিনি। এবারও হারালেন সেই শুভেন্দুই। গতবারের চেয়ে আরও বড় ব্যবধানে। নন্দীগ্রাম আসনে পাঁচ বছর আগে ১৯৫৬ ভোটে মমতাকে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। এবার জয়ের ব্যবধান আরও বাড়ালেন শুভেন্দু। ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে জয় পেয়েছেন তিনি।
সোমবার (৪ মে) গণনার শুরু থেকে ছিল টানটান উত্তেজনা। লড়াই যে হাড্ডাহাড্ডি হতে চলেছে সেই আভাস মিলেছিল সকাল থেকেই। ২০ রাউন্ডের গণনা- প্রথম রাউন্ড থেকেই শুরু হয়েছিল স্নায়ুর লড়াই। প্রথম রাউন্ডে মমতা এগিয়ে, তো দ্বিতীয় রাউন্ডে শুভেন্দু, তার পরের রাউন্ডে আবার এগিয়ে মমতা। প্রথম দিকের কয়েকটি রাউন্ড চলে এভাবেই। তার পরে পঞ্চদশ রাউন্ড পর্যন্ত টানা এগিয়ে ছিলেন মমতা। যদিও সপ্তম রাউন্ড থেকে টানা নিজের ভোট বৃদ্ধি করতে থাকেন শুভেন্দু। কমাতে থাকেন ব্যবধান। প্রতি রাউন্ডে একটু একটু করে ব্যবধান কমিয়ে ষোড়শ রাউন্ডে গিয়ে মমতাকে ছাপিয়ে যান তিনি। এরপরই ধীরে ধীরে তার হার নিশ্চিত হয়ে যায়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই যে শুধু হেরেছেন তাই নয়, তার সঙ্গে ডু্বেছে তৃণমূল কংগ্রেসও। ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের করছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটির ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনের গণনা হয়েছে। গেরুয়া শিবির পেয়েছে ২০৬টি আসন। অন্যদিকে, গত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮১টি আসন।
কংগ্রেসের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৭৭ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা বামফ্রন্ট জোটের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই না করার অভিযোগে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই আইনজীবী ও শিক্ষার্থীনেত্রী শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে কমিউনিস্টদের পরাজিত করে রাজ্য জয় করেন।
২০১৪ সালে মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই মমতা বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি তার রাজনীতিকে; বিশেষ করে মুসলিমদের সুরক্ষা প্রদানকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি নারীদের জন্য একগুচ্ছ জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করেন এবং বড় শিল্পের জন্য বিতর্কিত জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। চেন্নাইয়ের শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং নির্বাচনি পর্যবেক্ষক রাহুল ভার্মা বলেন, “মমতার প্রতি দৃশ্যমান জনসমর্থন ছিল এবং তিনি জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামোর বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ কাজ করছিল। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিনের জীবনে তাদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ নিয়ে মানুষ খুশি ছিল না।”
রাহুল ভার্মা বলেন, বিজেপি এবার অনেক বেশি পরিকল্পিত প্রচারণা চালিয়েছে। এটি বিজেপির জন্য কঠিন নির্বাচন ছিল। কিন্তু অসম্ভব ছিল না। অধ্যাপক ভার্মা বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জন্য একটি পথ খোলাই ছিল এবং সব পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় এই ফল এসেছে। শক্তিশালী সরকারবিরোধী হাওয়া ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে এমন ফলাফল সম্ভব হতো না।”
এবারের নির্বাচনে প্রায় ৬ কোটি ৮২ লাখ মানুষ ভোট দিয়েছেন। যা মোট ভোটের প্রায় ৯২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। রাজ্যের ইতিহাসে ভোটদানের একটি রেকর্ডও এটি। এ অবস্থাতেও মমতার তৃণমূলের এমন হার তার দলটির বড় পতনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক