ইরানে ‘নজিরবিহীন’ দমন-পীড়ন, নজরদারি বাড়াতে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত
শিশুসহ হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় ইরানের ওপর নজরদারি আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল। একই সঙ্গে ইরানে ‘নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন’ বন্ধের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) ৪৭ সদস্যের মানবাধিকার কাউন্সিল ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতায় ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে নজিরবিহীন মাত্রার সহিংস দমন-পীড়নের’ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
প্রস্তাবটির পক্ষে ২৫টি ভোট পড়ে, বিপক্ষে পড়ে সাতটি এবং বাকি দেশগুলো ভোটদানে বিরত থাকে। এর ফলে ইরানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের জন্য নিয়োজিত স্বাধীন তদন্তকারীদের ম্যান্ডেট (কার্যকাল ও ক্ষমতা) আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভোটের আগে কাউন্সিলের সামনে প্রস্তাবটি পেশ করার সময় আইসল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত আইনার গুনারসন বলেন, ভয়ের পরিবেশ এবং নিয়মতান্ত্রিক বিচারহীনতা মেনে নেওয়া যায় না। ভুক্তভোগী এবং বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা সত্য, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতা পাওয়ার যোগ্য।
জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে গৃহীত এই প্রস্তাবে ইরানে নিযুক্ত বিশেষ র্যাপোর্টিয়ারের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া, ২০২২ সালের নভেম্বরে গঠিত পৃথক একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের মেয়াদও দুই বছর বৃদ্ধি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, মাহসা আমিনি নামের এক কুর্দি নারীর পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে ইরানের কঠোর পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে সেই সময় এই মিশন গঠন করা হয়েছিল।
এই প্রস্তাবে তদন্তকারী সংস্থাকে ‘সাম্প্রতিক ও চলমান গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিক্ষোভ সংশ্লিষ্ট অপরাধগুলো তদন্ত করার ক্ষমতা প্রদান করেছে। ব্রিটেন, জার্মানি, আইসল্যান্ড, মলদোভা এবং উত্তর ম্যাসেডোনিয়ার অনুরোধে আয়োজিত একটি জরুরি অধিবেশন শেষে এই ভোটাভুটি হয়। তবে ইরান এর তীব্র সমালোচনা করেছে।
জবাবদিহিতা
অধিবেশনের শুরুতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক বর্ণনা করেন যে, কীভাবে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘তাজা গুলি’ ব্যবহার করেছে। তিনি জানান, বিক্ষোভে শিশুসহ হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
ভলকার তুর্ক বলেন, ‘আমি ইরানি কর্তৃপক্ষকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে, পিছু হটতে এবং সংক্ষিপ্ত বিচার ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ সাজাসহ তাদের এই নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের অবসান ঘটাতে আহ্বান জানাচ্ছি। আমি বিনা বিচারে আটক সকল ব্যক্তির অবিলম্বে মুক্তি এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর পূর্ণ স্থগিতাদেশের দাবি জানাচ্ছি।’
অধিবেশনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি মিশেল সার্ভোন ডি'উরসোও একই প্রতিধ্বনি করেন। তিনি বলেন, ‘বিগত সপ্তাহগুলোর ভয়াবহ ঘটনার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। যারা কেবল তাদের মানবাধিকার প্রয়োগ এবং বৈধ দাবি জানানোর জন্য নিহত, আহত বা আটক হয়েছেন, তাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’
তবে ইরানি রাষ্ট্রদূত আলী বাহরাইনি শুক্রবারের এই সভাকে ইরানের বিরুদ্ধে একটি ‘চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করে এর নিন্দা জানান। তার সহকর্মী সোমায়ে করিমদোস্ত মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রস্তাবকে ‘সম্পূর্ণ ভারসাম্যহীন, পক্ষপাতদুষ্ট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে বর্ণনা করেন।
কিউবা ও চীনসহ কয়েকটি দেশ ইরানের পক্ষে কথা বলেছে। কিউবার রাষ্ট্রদূত একে ‘চরম ভণ্ডামি’ বলে আখ্যা দেন এবং চীনের রাষ্ট্রদূত জিয়া গাইড বলেন, বেইজিং মানবাধিকারের অজুহাতে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধী।
ভয়াবহ পরিস্থিতি
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক এবং বিভিন্ন এনজিও জানিয়েছে, গত কয়েক বছরের মধ্যে ইরানের সবচেয়ে বড় এই বিক্ষোভ দমনের সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে কারণ সেখানে দুই সপ্তাহ ধরে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছিল।
বিক্ষোভ নিয়ে প্রথম সরকারি তথ্যে ইরানি কর্তৃপক্ষ বুধবার জানিয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক 'হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি' শুক্রবার নিহতের সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি বলে জানিয়েছে এবং সতর্ক করেছে যে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। নরওয়েভিত্তিক সংস্থা 'ইরান হিউম্যান রাইটস' সতর্ক করেছে যে নিহতের সংখ্যা ২৫ হাজারে পৌঁছাতে পারে।
বিক্ষোভ এখন অনেকাংশে থেমে গেলেও ভলকার তুর্ক সতর্ক করে বলেছেন, ‘ইরানের রাস্তায় হত্যাকাণ্ড কমলেও নিষ্ঠুরতা অব্যাহত রয়েছে।’ তিনি ইরানের বিচার বিভাগীয় প্রধানের বক্তব্যের সমালোচনা করেন, যেখানে বলা হয়েছিল আটক হাজার হাজার মানুষের প্রতি কোনো শিথিলতা দেখানো হবে না।
ভলকার তুর্ক বলেন, ‘বিক্ষোভের দায়ে আটক ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে কি না, তা নিয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’ তিনি উল্লেখ করেন, ইরান বিশ্বের সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং গত বছর সেখানে অন্তত দেড় হাজার মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে তথ্য রয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক