সাদ্দাম-নরিয়েগার পরিণতি হবে মাদুরোর?
ভেনেজুয়েলায় ‘বড় পরিসরে’ হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার (৩ জানুয়ারি) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ ঘোষণা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, তার সরকার মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানে না। খবর আলজাজিরার।
শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক অডিও বার্তায় ভাইস প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ সরকারের পক্ষ থেকে মাদুরো ও ফ্লোরেস যে এখনও বেঁচে আছেন, সে বিষয়ে প্রমাণ দাবি করেছেন।
মাদুরোর আটক হওয়ার এ খবর পানামার সাবেক সামরিক নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগা ও সাবেক ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বন্দি হওয়ার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়।
ম্যানুয়েল নরিয়েগা
১৯৮৯ সালে পানামা আক্রমণ করে দেশটির নেতা জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্র। পানামায় মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষা, অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, দুর্নীতি ও অবৈধ মাদক ব্যবসার অভিযোগ এনে ওই হামলা চালানো হয়েছিল।
পানামা আক্রমণ করার আগে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮৮ সালে মায়ামিতে নরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ এনেছিল, ঠিক যেমনটি তারা এবার মাদুরোর ক্ষেত্রে করেছে। ১৯৮৫ সালে নরিয়েগা নিকোলাস আরডিটো বারলেটাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলেন। ১৯৮৯ সালে তিনি নির্বাচন বাতিল করেন এবং আক্রমণ শুরুর আগে পানামায় মার্কিন-বিরোধী মনোভাবকে সমর্থন করতেন।
পানামায় যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ ছিল সেই সময়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় মার্কিন অভিযান। ওই অভিযানের জন্য মার্কিন সরকার বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করেছিল। মাদক পাচারের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে নরিয়েগাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া এবং পানামাবাসীদের ভাগ্যের উন্নতি করা ছিল হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম যুক্তি।
যখন জেনারেল নরিয়েগা মার্কিন আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রতি বাধ্য না থাকার লক্ষণ দেখাতে শুরু করেন, তখন ওয়াশিংটন তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে মায়ামির একটি আদালতে নরিয়েগার বিচার করা হয়েছিল ও ২০১০ সাল পর্যন্ত সেখানেই তাকে কারাবন্দি রাখা হয়েছিল। এরপর তাকে আরেকটি অভিযোগের বিচারের মুখোমুখি করতে ফ্রান্সের কাছে প্রত্যর্পণ করা হয়েছিল। এক বছর পর ফ্রান্স তাকে পানামায় ফেরত পাঠায়। অপরাধের সাজা ভোগ করা অবস্থায় ২০১৭ সালে পানামার কারাগারে তার মৃত্যু হয়।
সাদ্দাম হোসেন
২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে বন্দি করেছিল মার্কিন বাহিনী। এর নয় মাস আগে ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (ডব্লিউএমডি) থাকার মিথ্যা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইরাকে আক্রমণ শুরু করে।
নরিয়েগার মতো সাদ্দাম হোসেনও বহু বছর যুক্তরাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিলেন। ১৯৮০ এর দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধে ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে পেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম।
আরও পড়ুন : ভেনেজুয়েলায় কেন মার্কিন হামলা, মাদুরোর সঙ্গে কী ঘটতে যাচ্ছে?
২০০৩ সালের আক্রমণ শুরুর আগে কোনো ভিত্তি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, সাদ্দাম হোসেন আল-কায়েদার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিচ্ছিলেন। তবে, শেষ পর্যন্ত ইরাকে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায়নি।
সাদ্দাম হোসেন মার্কিন হামলা থেকে বাঁচতে নিজ শহর তিকরিতের কাছে ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক হন। ইরাকের আদালতে তার বিচার করা হয়। আদালতের রায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
জুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ
হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট জুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন এজেন্ট ও হন্ডুরাস বাহিনীর তার বাসভবন থেকে আটক করে।
২০২২ সালের এপ্রিলে দুর্নীতি ও অবৈধ মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রত্যর্পণ করা হয়। একই বছরের জুনে তাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের ১ ডিসেম্বর হার্নান্দেজের ক্ষমা ঘোষণা করেন।
এর কয়েকদিন পর হন্ডুরাসের শীর্ষ কৌঁসুলি হার্নান্দেজের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এতে সাবেক এই নেতা যুক্তরাষ্ট্রের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার কয়েকদিন পরই আইনি জটিলতা এবং দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও তীব্র হয়।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক