থাইল্যান্ড–কম্বোডিয়া সীমান্তে ফের সংঘর্ষ, বাড়ছে নিহতের সংখ্যা
থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্তে নতুন করে সংঘর্ষ শুরুর পর নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। সংঘর্ষের জন্য একে অপরকে দোষারোপ করছে দুই দেশই এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে।
কম্বোডিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার (৮ ডিসেম্বর) থেকে শুরু হওয়া সহিংসতায় এখন পর্যন্ত তাদের দেশে নয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একই সময়ে তাদের চারজন সেনা নিহত ও ৬৮ জন আহত হয়েছেন।
রোববার (৭ ডিসেম্বর) রাতে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়, যার ফলে কয়েক লাখ মানুষ ঘরছাড়া হন। এতে গত জুলাইয়ে পাঁচ দিনব্যাপী সংঘর্ষের পর যে নড়বড়ে শান্তি বজায় ছিল, তা ভেঙে পড়ে। জুলাইয়ের সেই লড়াইয়ে রকেট ও ভারী কামানের গোলাবর্ষণে উভয় পক্ষ মিলিয়ে অন্তত ৪৮ জন নিহত হন এবং সাময়িকভাবে প্রায় তিন লাখ মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়। পরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
তবে গত মাসে থাইল্যান্ড জানায়, একটি স্থলমাইন বিস্ফোরণে তাদের এক সেনা গুরুতর আহত হওয়ার পর তারা ওই যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়ন স্থগিত রেখেছে।
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতি্ন চার্নভিরাকুল বলেন, সম্ভাব্য আলোচনা নিয়ে কম্বোডিয়া থাইল্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি এবং সংঘর্ষ অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, আমাদের যা করতে হয়, তাই করতে হবে। সরকার আগেই নির্ধারিত সব ধরনের সামরিক অভিযানে পূর্ণ সমর্থন দেবে।
থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনীর দাবি, আজ মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) কম্বোডিয়া আর্টিলারি, রকেট ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে থাই অবস্থানগুলোতে আক্রমণ করেছে।
অন্যদিকে কম্বোডিয়ার প্রভাবশালী সিনেট সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেন বলেছেন, আগের দিন তারা পাল্টা হামলা থেকে বিরত ছিল, তবে রাতের দিকে থাই বাহিনীর গুলির জবাব দিতে শুরু করেছে কম্বোডিয়ার সেনারা। তিনি বলেন, কম্বোডিয়া শান্তি চায়, কিন্তু নিজের ভূখণ্ড রক্ষায় লড়াইয়ে বাধ্য হয়েছে।
উভয় দেশই প্রথম গুলি চালানোর দায় একে অপরের ওপর চাপাচ্ছে।
মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের নৌবাহিনী জানায়, উপকূলীয় প্রদেশ ত্রাতে নিজেদের ভূখণ্ড থেকে কম্বোডীয় বাহিনীকে সরিয়ে দিতে অভিযান চালানো হচ্ছে। নৌবাহিনীর অভিযোগ, কম্বোডিয়া সেখানে স্নাইপার ও ভারী অস্ত্র মোতায়েন করে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলছে, যা থাইল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের জন্য ‘গুরুতর হুমকি’।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেটকেও বলেন, কম্বোডিয়া এখনো শান্তি আলোচনার জন্য প্রস্তুত নয়। তিনি বলেন, পরিস্থিতি যখন কূটনীতির সুযোগ দেয়, তখনই কূটনীতি কাজ করে। দুঃখজনকভাবে এখন সেই সুযোগ নেই।
নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় উভয় দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। থাইল্যান্ডের দাবি, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে প্রায় চার লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কম্বোডিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
থাইল্যান্ডের দ্বিতীয় আর্মি রিজিয়নের তথ্যমতে, সীমান্তবর্তী চারটি প্রদেশে প্রায় ৫০০টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া তাদের ৮১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন অংশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধে রয়েছে। ১৯০৭ সালে ফ্রান্সের শাসনামলে সীমান্ত প্রথম মানচিত্রে চিহ্নিত হয়। এ বিরোধ মাঝে মাঝেই সহিংস সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে, যেমন ২০১১ সালে এক সপ্তাহব্যাপী গোলাবর্ষণ।
২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ১৯৬২ সালের রায় বহাল রেখে প্রেহ ভিহেয়ার মন্দিরসংলগ্ন ভূমির একটি অংশ কম্বোডিয়ার বলে ঘোষণা করে। তবে এ বিষয়ে আইসিজের বিচারাধীনতা স্বীকার করে না থাইল্যান্ড।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক