লজ্জার হারের কারণ হিসেবে যা বললেন বাংলাদেশের কোচ
ফিফা আসিয়ান কাপে নিজেদের শেষ ম্যাচে স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে রীতিমতো গোলবন্যায় ভেসে গেছে বাংলাদেশ। মাঠ ছেড়েছে ৯-২ গোলের লজ্জার হার নিয়ে। যেটি হয়তো কল্পনাতেও ছিল না কারো। দুই অর্ধের শেষ ১৫ মিনিট করে সবচেয়ে বেশি গোল হজম করেছে বাংলাদেশ।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে দলের এমন ভরাডুবির কারণ ব্যাখ্যা করেছেন বাংলাদেশের প্রধান কোচ টমাস ডুলি। এমন লজ্জাজনক হারের কারণ হিসেবে দুই দলের মান, র্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধান এবং কাঠামোগত পার্থক্যের কথা বলেছেন ডুলি।
বাংলাদেশের কোচের মতে, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে দুই দলের এই বিশাল ব্যবধানই মূলত মাঠের খেলায় মূল পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। ডুলি বলেন, ‘আপনি যদি ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ১৮১ নম্বরে থাকেন এবং আপনার প্রতিপক্ষ যদি ১১৬, ১৩০ কিংবা ১৪০ নম্বরের দল হয়, তবে সেটি স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে যে র্যাঙ্কিংয়ে যত ওপরে থাকা যায়, খেলোয়াড় ও দল হিসেবে তারা ততটাই উন্নত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ফুটবল পরিকাঠামো ও দলগুলো নিশ্চিতভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে।’
আসিয়ান কাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ফাইনালে যাওয়ার জন্য ইন্দোনেশিয়ার সামনে বড় ব্যবধানে জয়ের বিকল্প ছিল না। মালয়েশিয়াকে গোল ব্যবধানে পেছনে ফেলে ফাইনালে ওঠার তাড়না ছিল স্বাগতিকদের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার সমান ৭ পয়েন্ট হলেও গোল গড়ে এগিয়ে থেকে ঠিকই ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে ইন্দোনেশিয়া।
ম্যাচের শুরু থেকেই খেই হারায় লাল-সবুজের দল। মাত্র ১১ মিনিটের মাথায় প্রথম গোল হজম করার পর থেকেই মূলত হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের রক্ষণভাগ। বিশেষ দুই অর্ধের শেষ সময়গুলোতে। প্রধমার্ধের শেষ ১৫ মিনিটে হজম করেছিল ৪ গোল আর দ্বিতীয়ার্ধের শেষ ৭ মিনিটে হজম করেছে ৩ গোল। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধের শেষ মিনিটেই ২ গোল হজম করেছে বাংলাদেশ।
মাঠের খেলায় সিদ্ধান্তের গতি এবং কৌশলগত দূরত্বের কথা তুলে ধরে ডুলি বলেন, ‘এ ধরনের শক্তিশালী ও গতিময় প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হলে স্বাভাবিকভাবেই খেলোয়াড়দের চিন্তাভাবনা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং খেলার গতি অনেকটাই মন্থর হয়ে পড়ে। ফুটবলে দিনশেষে আসল বিষয় হলো গতি—পরিস্থিতি কত দ্রুত বুঝে বল নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছেন এবং মাঠে সেটি কতটা নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করছেন।’
খেলোয়াড়দের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে ডুলি জানান, আন্তর্জাতিক ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে একজন খেলোয়াড়ের কমপক্ষে ১০ হাজার ঘণ্টার নিবিড় অনুশীলনের প্রয়োজন হয়, যা মূলত বছরের পর বছর ধরে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে পরিশ্রম করার সমতুল্য।
ডুলি বলেন, ‘মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড কিংবা ইন্দোনেশিয়ার ঘরোয়া লিগ আমাদের দেশের লিগের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও শক্তিশালী। তারা সারা বছর ধরেই নিয়মিত অনুশীলনের মধ্যে থাকে এবং প্রতি সপ্তাহে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ খেলে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়ার অনেক ফুটবলার বর্তমানে বুন্দেসলিগা, নেদারল্যান্ডস কিংবা ইতালির মতো ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় লিগগুলোতে খেলছে, যা তাদের পারফরম্যান্সে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
এদিকে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে গুঞ্জন উঠেছিল যে কোচ টমাস ডুলি আসলে আসিয়ান কাপে দল নিয়ে খেলতে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। বরং তুলনামূলক কম শক্তির দলের বিপক্ষে খেলে আসন্ন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতি নিতে চেয়েছেন তিনি। তবে টুর্নামেন্ট শেষের সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিযোগিতাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন তিনি।
ডুলি বলেন, ‘র্যাঙ্কিংয়ে অনেক পিছিয়ে থাকা দুর্বল দলগুলোর বিপক্ষে খেলে কেবল জয় তুলে নেওয়াটা দেখতে হয়তো ভালো লাগে এবং দলের সাময়িক আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, কিন্তু তাতে খেলোয়াড়দের সত্যিকারের কোনো উন্নতি হয় না। যখন আপনি প্রকৃত অর্থেই গতিময় ও শক্তিশালী দলের মুখোমুখি হবেন, কেবল তখনই এই ব্যবধানটা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়।’
ম্যাচে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্সের চিত্র ছিল বেশ বৈপরীত্যপূর্ণ। প্রথমার্ধে ৬-১ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে বেশ কিছুক্ষণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল দল। ম্যাচের ৯০ মিনিট পর্যন্ত আর কোনো গোল হজম করেনি বাংলাদেশ। কিন্তু ম্যাচের যোগ করা সময়ের মাত্র ৭ মিনিটের ঝড়ে হুড়মুড় করে আরও ৩টি গোল খেয়ে বসে ডুলির দল।
ভবিষ্যতের প্রস্তুতি ও উন্নতির পথ নিয়ে আশাবাদী কোচ জানান, ভিডিও অ্যানালিসিসের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের বারবার তাদের পজিশন ও ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা ভবিষ্যতে সেই ভুলগুলো শুধরে নিতে পারে।
বাংলাদেশের এই যুক্তরাষ্ট্রের কোচ বলেন, ‘বড় ধরনের উন্নতি তো আর রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে এই টুর্নামেন্ট থেকে আমরা যে তিক্ত অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা পেয়েছি, তা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু করার চেষ্টা করব।’

স্পোর্টস ডেস্ক