ইতিহাস গড়া ইনিংসেও ভারতের কাছে হারল ওয়েস্ট ইন্ডিজ
ব্যাটিংয়ে নেমে রানের ফুলঝুরি ফোটাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জনাথন ক্যাম্পবেল, শাই হোপ আর আমির জাঙ্গুর সেঞ্চুরিতে ইতিহাস গড়া ইনিংস গড়ল ক্যারিবীয়রা। তবে গল্পের অনেক কিছু বাকি ছিল তখনো। ৪০০ রানের পাহাড় গড়া রান তাড়া করতে নেমে নতুন ইতিহাস লিখলেন শুভমান গিল। তাকে যোগ্য সঙ্গ দিলেন অভিজ্ঞ রোহিত শর্মা। তবে গিল ছিল অনবদ্য। তার ইতিহাস গড়া অবিশ্বাস্য জয় তুলে নেয় ভারত।
আজ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ভারতের গোয়াহাটিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ৪০২ রান করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জবাব দিতে নেমে ৪৩.৩ ওভারে ৮ উইকেট হাতে রেখেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ভারত।
বড় লক্ষ্য সামনে রেখে ভারতীয় ইনিংস শুরু করেন রোহিত শর্মা ও শুভমান গিল। শুরু থেকেই দুজনের ব্যাটে দেখা যায় পাল্টা আক্রমণ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের ওপর চাপ তৈরি করে দ্রুত রান তুলতে থাকেন দুই ওপেনার।
রোহিত নিজের অভিজ্ঞতার ছাপ রেখে এগিয়ে যান সেঞ্চুরির দিকে। ৭৫ বলে শতক পূর্ণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ১০১ রান করে থামেন ভারতীয় তারকা। গিলের সঙ্গে তার উদ্বোধনী জুটিতে আসে ২৫৫ রান, যা ভারতের বিশাল রান তাড়ার ভিত গড়ে দেয়।
রোহিত আউট হওয়ার পরও থামেননি গিল। বরং সেখান থেকেই শুরু হয় তার একখ আধিপত্য। একের পর এক বাউন্ডারি হাঁকিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন ভারতীয় অধিনায়ক। ১১৭ বলে দ্বিশতক পূর্ণ করে ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্রুততম দ্বিশতকের রেকর্ড নিজের করে নেন তিনি।
এর আগে এই রেকর্ড ছিল ভারতেরই ঈশান কিষানের দখলে। ২০২২ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ১২৬ বলে দ্বিশতক করেছিলেন ঈশান। এবার ৯ বল কম নিয়েই সেই রেকর্ড ভেঙে দেন গিল।
দ্বিশতকের সঙ্গে আরও একটি বিরল কীর্তি গড়েছেন গিল। রোহিত শর্মার পর দ্বিতীয় ব্যাটার হিসেবে ওয়ানডেতে একাধিক দ্বিশতক করার রেকর্ড এখন তার। ২০২৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২০৮ রান করেছিলেন গিল। এবার সেটিকে ছাড়িয়ে নিজের দ্বিতীয় দ্বিশতক তুলে নেন ভারতীয় অধিনায়ক।
শুধু তাই নয়, রান তাড়া করতে নেমে দ্বিশতক করা বিশ্ব ক্রিকেটের মাত্র দ্বিতীয় ব্যাটারও হয়েছেন গিল। এর আগে এই কীর্তি ছিল অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের। ২০২৩ সালের ওডিয়াই বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে রান তাড়া করতে নেমে ২০১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন ম্যাক্সওয়েল।
গিলের ইনিংস থামে নি দ্বিশতকেও। শেষ পর্যন্ত ১৩৩ বলে ২২৩ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। তার ব্যাট থেকে আসে ২৬টি চার ও ৮টি ছক্কা। ওয়ানডেতে রান তাড়া করে এটিই সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস।
এই ম্যাচে বিরাট কোহলির প্রসঙ্গও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৩৯ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন কোহলি এবং ওয়ানডেতে ১৫ হাজার রান পূর্ণ করা মাত্র দ্বিতীয় ব্যাটার হয়েছিলেন তিনি, শচীন টেন্ডুলকারের পর। ফলে গিলের এই রেকর্ডের ম্যাচেও ভারতের অভিজ্ঞ ব্যাটিং লাইনআপের আলোচনায় ছিলেন কোহলি।
শেষদিকে গিলকে সঙ্গ দেন রুতুরাজ গায়কোয়াড়। দুজনের ব্যাটে ভর করে মাত্র ৪৩.৩ ওভারেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ভারত। ৪০৬ রান করে ভারত ম্যাচটি জেতে ৮ উইকেটে। হাতে থাকে ৩৯ বল।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে ওয়ানডেতে ভারতের সর্বোচ্চ সফল রান তাড়ার রেকর্ডও তৈরি হলো। এর আগে ২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩৬২ রান তাড়া করে জয় ছিল ভারতের সর্বোচ্চ। এবার সেই রেকর্ড অনেকটাই পিছনে ফেলে নতুন ইতিহাস গড়ল ভারত।
আরেকটি বড় অর্জনও এসেছে এই জয়ে। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে ভারত।
একদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের তিন ব্যাটারের সেঞ্চুরিতে ৪০৫ রানের বিশাল সংগ্রহ, অন্যদিকে ভারতের গিল-রোহিতের ব্যাটিং তাণ্ডব। সব মিলিয়ে গুয়াহাটির ম্যাচটি হয়ে থাকল রেকর্ড আর রানের এক অসাধারণ প্রদর্শনী। তবে সেই প্রদর্শনীর সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম শুভমান গিল, যার ২২৩ রানের অপরাজিত ইনিংস শেষ পর্যন্ত ম্যাচের সব আলো নিজের দিকে টেনে নেয়।
এর আগে টস হেরে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জন ক্যাম্পবেলের ব্যাটে আসে ঝড়ো সেঞ্চুরি। মাত্র ৬৫ বলেই শতক পূর্ণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৬৮ বলে ১০১ রান করেন ক্যাম্পবেল। তার ইনিংসে ছিল ৯টি চার ও ৫টি ছক্কা। ওপেনিংয়ে তার আগ্রাসী ব্যাটিং ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দেয়।
ক্যাম্পবেলের পর ইনিংসের হাল ধরেন অধিনায়ক শাই হোপ। ভারতীয় বোলারদের ওপর চাপ ধরে রেখে তিনিও তুলে নেন সেঞ্চুরি। ৯৪ বলে ১০৪ রান করেন হোপ। তার সঙ্গে আমির জাঙ্গুর জুটি ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আরও বড় সংগ্রহের দিকে নিয়ে যায়।
শেষদিকে আমির জাঙ্গুর ব্যাটেও দেখা যায় বিধ্বংসী ব্যাটিং। ৭৭ বলে ১১৪ রান করে দলকে ৪০০ রানের গণ্ডি পার করান তিনি। ফলে ওয়ানডেতে একই ইনিংসে তিন ব্যাটারের সেঞ্চুরির বিরল কীর্তি গড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
৫০ ওভার শেষে ৭ উইকেটে ৪০৫ রান সংগ্রহ করে ক্যারিবীয় দল। ওয়ানডেতে এটিই ওয়েস্ট ইন্ডিজের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ। ভারতের বিপক্ষেও এটি বড় সংগ্রহগুলোর একটি। ভারতীয় বোলারদের মধ্যে কুলদীপ যাদব ছিলেন কার্যকর, তিনি ৬৫ রানে ২ উইকেট নেন। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিংয়ের দাপটে ভারতকে নামতে হয় ৪০৬ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়ায়।

স্পোর্টস ডেস্ক