স্বপ্নের শিরোপা জিতলেন স্ফেরেফ
আম্পায়ারের কণ্ঠে ভেসে এলো, ‘গেম, সেট এবং ম্যাচ স্ফেরেফ।’ অথচ স্ফেরেফ তখনও নির্বিকার। যেন কিছুই হয়নি। পরের সার্ভ করার প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন বেজলাইনের দিকে। ধারাভাষ্যকারও বিস্ময় লুকাতে পারেননি। হাসতে হাসতে বললেন, ‘স্ফেরেফ হয়তো জানেনই না যে ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে!’
পেশাদার ক্যারিয়ারের প্রথম ১২ বছরে কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা জিততে পারেননি আলেক্সান্ডার স্ফেরেফ। তবে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে দারুণভাবে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দুটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছেন জার্মান এই তারকা। ১১তম চেষ্টায় জিতেছেন ইউএস ওপেনের শিরোপাও।
ইউএস ওপেন ফাইনালের শেষ মুহূর্ত। টিভি পর্দা ও কোর্টের বড় পর্দায় ভেসে উঠেছে ‘ম্যাচ পয়েন্ট’। আলেক্সান্ডার স্ফেরেফের সার্ভিস রিটার্ন বাইরে মেরে দিলেন বেন শেল্টন। গ্যালারিজুড়ে শুরু হলো উল্লাস আর করতালি।
খেলার মধ্যে এতটাই ডুবে ছিলেন ২৯ বছর বয়সী এই জার্মান তারকা যে, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মুহূর্তটিও বুঝতে পারেননি। দর্শকদের উচ্ছ্বাসে একপর্যায়ে সম্বিত ফেরে তার। বড় পর্দায় ভেসে ওঠে চওড়া হাসি। এরপর দুই হাত উঁচিয়ে ছুটে যান স্ফেরেফ।
এই কোর্টেই ছয় বছর আগে তেতো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। ২০২০ সালের ইউএস ওপেন ফাইনালে দুই সেটে এগিয়ে গিয়েও শিরোপা জিততে পারেননি। এবার সেই দুঃস্বপ্নকে পেছনে ফেলে স্বপ্নের শিরোপা জিতলেন তিনি। ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রের বেন শেল্টনকে ৬-৩, ৭-৬ (২), ৫-৭, ৬-২ গেমে হারান স্ফেরেফ।
ক্যারিয়ারের প্রথম এক যুগে কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা ছিল না তার। ২০২০ সালের ইউএস ওপেনের পর গত বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালেও হেরেছিলেন। এবার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মাত্র তিন মাসের মধ্যে জিতলেন দুটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম। গত জুনে ফরাসি ওপেনের শিরোপাও উঠেছিল স্ফেরেফের হাতে।
ইউএস ওপেন জিতেছেন ১১তম প্রচেষ্টায়। পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন গ্র্যান্ড স্ল্যাম ইতিহাসের রেকর্ড ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার। নারী এককে চ্যাম্পিয়ন এলেনা রিবাকিনাও পেয়েছেন একই পরিমাণ অর্থ।
ম্যাচ শেষে স্ফেরেফ জানান, ক্যারিয়ারজুড়ে লেগে থেকে হাল না ছাড়ার ফলই এখন পাচ্ছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, ঈশ্বর দেখেছেন আমরা কতটা কঠোর পরিশ্রম করেছি, কতটা কষ্ট সহ্য করেছি, কতটা যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। আমি মনে করি ২০২৬ সাল হলো এর আগের সমস্ত বছরের ফলাফল।’
নিজের স্বপ্ন পূরণ করলেও এতে স্থানীয় দর্শকদের হৃদয় ভেঙেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পুরুষ খেলোয়াড়ের গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হলো। দর্শকদের নিয়ে স্ফেরেফ বলেন, ‘আমি জানি যে, আজ ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষই চেয়েছিল বেন শেল্টন জিতুক। এজন্য আমি খুবই দুঃখিত। যদিও জানি যে দর্শকেরা আমার বিপক্ষে ছিল, তারা সবসময়ই অবিশ্বাস্যরকম ন্যায্য ছিল এবং খেলোয়াড় হিসেবে আমরা এর প্রশংসা করি।’
শেল্টনের জন্যও ফাইনালটি ছিল বিশেষ। এটিই ছিল তার ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনাল। দুজনের খেলার ধরনও অনেকটা কাছাকাছি হওয়ায় জমজমাট লড়াইয়ের প্রত্যাশা ছিল। তবে শুরু থেকেই স্ফেরেফের দাপটে বেশ অসহায় হয়ে পড়েন ২৩ বছর বয়সী শেল্টন।
ম্যাচের অন্যতম সেরা পয়েন্ট অবশ্য জিতে নেন শেল্টন। ষষ্ঠ গেমে ড্রপ শট ধরতে গিয়ে নেটের কাছে জমে ওঠে দারুণ লড়াই। সেই পয়েন্ট নিজের করে নেন তিনি। এরপর ম্যাচের মোড় ঘোরাতে সার্ভ অ্যান্ড ভলি কৌশলও ব্যবহার করেন। কিন্তু সেটি কাজে লাগেনি। উল্টো ডাবল ফল্ট করে সেটটি স্ফেরেফের হাতে তুলে দেন শেল্টন।
দ্বিতীয় সেটেও স্থানীয় দর্শকদের সমর্থন ছিল শেল্টনের পক্ষে। নবম গেমে স্ফেরেফ ডাবল ফল্ট করতেই গ্যালারিতে শুরু হয় তুমুল উল্লাস। ‘লেটস গো বেন’, ‘কাম অন বেন’ স্লোগানে গ্যালারি মুখর থাকলেও স্ফেরেফকে টলানো যায়নি। টাইব্রেকারে ৫-০ পয়েন্টে এগিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সেটও জিতে নেন তিনি।
তৃতীয় সেটে অবশ্য লড়াইয়ে ফেরেন শেল্টন। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল, সহজেই ম্যাচ শেষ করে দেবেন স্ফেরেফ। ষষ্ঠ গেমে দুর্দান্ত ব্যাকহ্যান্ড উইনারে ব্রেক পয়েন্ট বাঁচান তিনি। দুই গেম পর হতাশায় পড়ে যান শেল্টন। পিছলে কোর্টে আছড়ে পড়ে বিরক্তিতে গালিও দেন।
তবে সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়ান তিনি। বেজলাইন থেকে একের পর এক শক্তিশালী গ্রাউন্ডস্ট্রোকে স্ফেরেফকে চাপে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত সার্ভিস ব্রেক করে ম্যাচ নিয়ে যান চতুর্থ সেটে। তবে শেল্টনের সেই প্রত্যাবর্তন ছিল সাময়িক। চতুর্থ সেঠের শুরুতেই ২৫ শটের একটি দীর্ঘ র্যালির পর ব্রেক নিশ্চিত করেন স্ফেরেফ। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে। সেই সুবিধা ধরে রেখে সহজেই ম্যাচ শেষ করেন জার্মান তারকা।
আরও একটি কারণে এবারের ফাইনাল ছিল ঐতিহাসিক। আর্থার অ্যাশের পর ৫৪ বছর পর নিউইয়র্কের ফাইনালে খেলা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান পুরুষ খেলোয়াড় ছিলেন শেল্টন। তবে শেষটা হলো হতাশায়।
শেল্টনের বান্ধবী ও ফুটবল তারকা ট্রিনিটি রডম্যানও প্রায় ২০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে প্লেয়ার্স বক্সে পৌঁছান। দুজনের খেলার সময়সূচি প্রায় মিলে যাওয়ায় তার ম্যাচটি সরাসরি দেখার সুযোগ হয়নি। ফলে সঙ্গীর জয়ও দেখা হলো না তার।
ম্যাচ শেষে শেল্টন অবশ্য হতাশার মধ্যেও ইতিবাচক থাকার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমার সাফল্যগুলো যেমন উপহার, ব্যর্থতাগুলোও তেমনি উপহার এবং আপনাদের সামনে এখানে খেলতে পারাটাও বড় উপহার।’
স্ফেরেফের জন্য এই শিরোপা ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ। গ্র্যান্ড স্ল্যামে একের পর এক ব্যর্থতার পাশাপাশি মাঠের বাইরের বিতর্কও তাকে ভুগিয়েছে। পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। তবে সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
কোর্টেও সাম্প্রতিক সময়ে ইয়ানিক সিনার ও কার্লোস আলকারাসের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছিলেন না স্ফেরেফ। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ওই দুজনই ভাগাভাগি করে জিতেছেন সব গ্র্যান্ড স্ল্যাম। চলতি বছরও প্রথম দুটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছিলেন তারা।
বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জেতেন আলকারাস। তবে দীর্ঘ চোট কাটিয়ে ইউএস ওপেনে ফিরে কোয়ার্টার ফাইনালেই শেল্টনের কাছে হেরে বিদায় নেন তিনি। অন্যদিকে, চলতি বছরের উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন সিনার চোটের কারণে ইউএস ওপেন থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে স্ফেরেফের পথ কিছুটা সহজ হয়েছিল বলেই মনে করছেন অনেকে।
শিরোপা জয়ের পর স্ফেরেফকে প্রশ্ন করা হয়, নিজেকে এখন বিশ্বের এক নম্বর মনে করেন কি না। জবাবে বাস্তবতাই তুলে ধরেছেন তিনি। স্ফেরেফ বলেন, ‘সিনার চোটের কারণে বাইরে থাকায় এবং আলকারাস চার মাস পর চোট থেকে ফিরে আসায়, এই মুহূর্তে হয়তো হ্যাঁ, আমিই এক নম্বর। তবে যদি তারা দুজনেই সুস্থ থাকত এবং দুজনেই তাদের সেরা ফর্মে থাকত, তাহলে হয়তো আমি এক নম্বর নই যদি সবাই সুস্থ থাকে, আমার মনে হয় ইয়ানিক এখনও এগিয়ে থাকবে। ব্যাপারটা এরকমই সাধারণ।’

স্পোর্টস ডেস্ক