স্পেনের যে ছকে পরাস্ত হলো ফ্রান্স
ফ্রান্সের বিপক্ষে জিততে স্পেন শুধু মাঠের লড়াইয়ে এগিয়ে ছিল না। ছিল কৌশলের দিক থেকেও। সেমিফাইনালের বড় মঞ্চে এমবাপ্পের গতি ও ফ্রান্সের আক্রমণভাগের শক্তি থামাতে স্পেনের কোচ সাজিয়েছিলেন বিশেষ পরিকল্পনা। ৪-৩-৩ ফরমেশনে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণে নিখুঁত সমন্বয় এবং প্রতিপক্ষের জায়গা বন্ধ করার কৌশলে ফ্রান্সের আক্রমণের ধার কমিয়ে দেয় লা রোহারা।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের ২-০ গোলের হার শুধু স্কোরলাইনের প্রতিফলন নয়। এটি ছিল কৌশলের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ার চিত্র। তারকায় ভরা ফরাসি দল মাঠে নামলেও নিজেদের পরিচিত গতির ফুটবল খেলতে পারেনি। কারণ শুরু থেকেই তাদের শক্তির জায়গাগুলো চিহ্নিত করে স্পেন পরিকল্পনা সাজিয়েছিল।
স্পেনের কোচ শুরু থেকেই ৪-৩-৩ ফরমেশনে দল সাজান। এই ছকের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল মাঝমাঠে সংখ্যার আধিপত্য। তিন মিডফিল্ডার একদিকে যেমন বলের নিয়ন্ত্রণ রেখেছেন, অন্যদিকে ফ্রান্সের আক্রমণ তৈরির পথও বন্ধ করেছেন। ফরাসি মিডফিল্ডাররা সামনে বল পাঠানোর পর্যাপ্ত জায়গা খুঁজে পাননি, ফলে আক্রমণভাগের সঙ্গে তাদের সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, ফ্রান্স খেলেছে ৪-২-৩-১ ফরমেশনে। তাদের পরিকল্পনা ছিল মাঝমাঠ থেকে দ্রুত বল বের করে এমবাপ্পে ও আক্রমণভাগের অন্য ফুটবলারদের গতি কাজে লাগানো। কিন্তু স্পেনের মিডফিল্ডের কারণে সেই পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি। দুই দলের ফরমেশনের লড়াইয়ে স্পেনের তিন মিডফিল্ডার ফ্রান্সের দুই মিডফিল্ডারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেন।
স্পেনের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ফ্রান্সের আক্রমণের মূল অস্ত্র এমবাপ্পেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। সাধারণত খোলা মাঠ পেলেই ভয়ংকর হয়ে ওঠেন ফরাসি তারকা। কিন্তু স্পেন তাকে সেই সুযোগই দেয়নি। মার্ক কুকুরেলা শুরু থেকেই এমবাপ্পের গতির সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একা লড়াইয়ের সুযোগ না দিয়ে সতীর্থদের সহায়তায় তিনি এমবাপ্পের জায়গা সংকুচিত করে দিয়েছেন।
মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পাশাপাশি ফ্রান্সের আরেকটি সমস্যা ছিল আক্রমণে জায়গা তৈরি করতে না পারা। এমবাপ্পে, দেম্বেলে কিংবা ওলিসেরা বল পেলেও সামনে ছিল স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ। ডিফেন্সের সামনে স্পেনের মিডফিল্ডের শক্ত অবস্থান ফ্রান্সকে বক্সের কাছে পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি।
স্পেনের কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বল হারানোর পর দ্রুত প্রেসিং। ৪-৩-৩ ফরমেশনে উইঙ্গার ও মিডফিল্ডাররা একসঙ্গে চাপ তৈরি করায় ফ্রান্স সহজে পাল্টা আক্রমণে যেতে পারেনি। সাধারণত যে দ্রুত ট্রানজিশনে ফ্রান্স প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে, সেই অস্ত্রটিই নিষ্ক্রিয় করে দেয় স্পেন।
আক্রমণেও স্পেন ছিল ধৈর্যশীল। তারা তাড়াহুড়ো না করে নিজেদের পাসিং ফুটবল ধরে রেখেছে। উইং ব্যবহার করে ফ্রান্সের রক্ষণে ফাঁক তৈরি করার চেষ্টা করেছে এবং সুযোগ পাওয়ার পর তা কাজে লাগিয়েছে। পুরো ম্যাচে তাদের খেলায় ছিল নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস।
শেষ পর্যন্ত স্পেনের জয় ছিল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের নিখুঁত সমন্বয়। ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তারা শুধু নিজেদের খেলা খেলেনি, প্রতিপক্ষের শক্তি ও দুর্বলতা বুঝে মাঠে নেমেছিল।
৪-৩-৩ ফরমেশনে মাঝমাঠের আধিপত্য, এমবাপ্পেকে আটকে রাখার কৌশল এবং রক্ষণে সমন্বিত প্রতিরোধের মাধ্যমে স্পেন প্রমাণ করেছে, বড় ম্যাচে সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে থাকে সঠিক কৌশল ও দলীয় ঐক্যে।

স্পোর্টস ডেস্ক