যে মন্ত্রে বদলে গেল নরওয়ের ফুটবল
কদিন আগেও বিশ্ব ফুটবলে নরওয়ের নাম খুব বেশি আলোচনায় আসত না। শীতপ্রধান এই দেশটি পরিচিত ছিল মূলত শীতকালীন খেলাধুলার জন্য। কিন্তু গত দুই দশকে পরিকল্পিত উদ্যোগ, আধুনিক অবকাঠামো এবং প্রতিভা তৈরির নতুন পদ্ধতিতে বদলে গেছে তাদের ফুটবলের চেহারা। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের পর দীর্ঘ ২৮ বছর অপেক্ষা শেষে ২০২৬ বিশ্বকাপে ফিরে এসে এখন তারা জায়গা করে নিয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালে।
নরওয়ের এই উত্থানের গল্পে সবচেয়ে উজ্জ্বল দুই নাম আর্লিং হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ড। ম্যানচেস্টার সিটির স্ট্রাইকার হালান্ড বিশ্বকাপে সাত গোল করে আক্রমণভাগের বড় ভরসা হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে আর্সেনাল ও নরওয়ে জাতীয় দলের অধিনায়ক ওডেগার্ড নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাঝমাঠ থেকে। নরওয়ের সাফল্য শুধু এই দুই তারকাকে ঘিরে নয়। পুরো একটি ফুটবল ব্যবস্থার পরিবর্তনের ফল এটি।
বিশ্বকাপের ২৬ সদস্যের নরওয়ে দলে ১৭ জন খেলোয়াড় ইউরোপের শীর্ষ চার লিগে খেলছেন। তাদের বেশিরভাগই উঠে এসেছেন নরওয়ের জাতীয় যুব উন্নয়ন প্রকল্প ‘ন্যাশনাল টিম স্কুল’ (এনটিএস) থেকে। ২০১৩ সালে চালু হওয়া এই উদ্যোগ দেশটির ফুটবলে বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছিল।
নরওয়ের ফুটবল বিপ্লবের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০০০ সালের পর থেকে। কঠিন শীতের কারণে আগে যেখানে ফুটবল খেলা সীমিত ছিল। সেখানে দেশটি কৃত্রিম মাঠ তৈরিতে বড় বিনিয়োগ শুরু করে। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নরওয়েতে ৫৩৯টি নতুন কৃত্রিম মাঠ তৈরি হয়েছে এবং আরও ৫৮৬টি মাঠ সংস্কার করা হয়েছে। এর ফলে ফুটবল আর শুধু গ্রীষ্মের খেলা থাকেনি, বরং সারা বছর অনুশীলনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
২০১২ সালের ইউরোতে জায়গা করতে ব্যর্থ হওয়ার পর নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন নতুন পরিকল্পনা হাতে নেয়। এর পরের বছর, ২০১৩ সালে চালু হয় ন্যাশনাল টিম স্কুল বা এনটিএস। এটি কোনো নির্দিষ্ট একাডেমি নয়। বরং স্থানীয় ক্লাব, জেলা পর্যায়ের ফুটবল, বড় ক্লাব ও ফেডারেশনকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করা একটি উন্নয়ন কাঠামো ছিল। এই ব্যবস্থার ফল এখন জাতীয় দলে দেখা যাচ্ছে। ব্রাজিলের বিপক্ষে ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলা নরওয়ের ১৫ ফুটবলারের মধ্যে ১৪ জনই জাতীয় যুব দলে খেলেছেন।
নরওয়ের ফুটবল দর্শনের বড় একটি অংশ হলো, তরুণ খেলোয়াড়দের খুব দ্রুত আলাদা করে না ফেলা। যেখানে অনেক দেশে আট বছর বয়সেই প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা বড় ক্লাবের একাডেমিতে চলে যায়। সেখানে নরওয়েতে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত তারা স্থানীয় ক্লাবের সঙ্গেই থাকে। তাদের বিশ্বাস, একজন খেলোয়াড়ের সবচেয়ে বড় গুণ হলো ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের উন্নতির দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা।
এই দর্শনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ এরলিং হালান্ড। ১৪ বছর বয়সে তিনি নরওয়ের প্রতিভা উন্নয়ন ব্যবস্থার অংশ হয়েছিলেন। তবে তখন কেউ ভাবেনি, তিনি ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হয়ে উঠবেন। অন্যদিকে মার্টিন ওডেগার্ডকে ছোটবেলা থেকেই বিশেষ প্রতিভা হিসেবে দেখেছিলেন নরওয়ের কর্মকর্তারা। ১১ বছর বয়সে তাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তারা। পরে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ২০১৫ সালে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়েছিলেন ওডেগার্ড।
নরওয়ের ফুটবল উন্নয়নে অর্থনৈতিক শক্তিও বড় ভূমিকা রেখেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত জুয়া প্রতিষ্ঠান নর্স্ক টিপিংয়ের আয়ের বড় অংশ ক্রীড়া খাতে বিনিয়োগ করা হয়। ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি ২০০ কোটি নরওয়েজিয়ান ক্রোনারের বেশি অর্থ ক্রীড়া অবকাঠামোর জন্য দিয়েছে। মাঠ, প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের নরওয়ে।
তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দলীয় ঐক্য। হাকন গ্রটল্যান্ডের ভাষায়, “কোনো একজন খেলোয়াড় দলের চেয়ে বড় নয়।” হালান্ড-ওডেগার্ডরা যেখানে এই প্রজন্মের মুখ, সেখানে তাদের পেছনের দুই দশকের পরিকল্পনাই নরওয়ের ফুটবল বিপ্লবের আসল গল্প হয়ে আছে।

স্পোর্টস ডেস্ক