তারকার ঝলকে ম্লান হচ্ছে দলগত ফুটবলের গল্প
বিশ্বকাপ মানেই একসময় ছিল একটি দেশের, একটি দলের এবং কোটি সমর্থকের স্বপ্নপূরণের গল্প। মাঠে ১১ জনের সমন্বয়, কোচের কৌশল, দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং নিখুঁত দলগত বোঝাপড়াই ছিল সাফল্যের মূল ভিত্তি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই গল্পও বদলেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ যেন আরও স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিচ্ছে— এখন অনেক ক্ষেত্রেই ম্যাচের ফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় থাকেন একজন ফুটবলার।
পর্তুগালের প্রথম ম্যাচে কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্রয়ের পরও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল— ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো গোল করলেন কি না। ফ্রান্সের জয় মানেই কিলিয়ান এমবাপ্পের পারফরম্যান্সের বিশ্লেষণ। আবার গোল্ডেন বুটের লড়াইও যেন গ্রুপ পর্বের পাশাপাশি আরেকটি বড় আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
এই পরিবর্তন অবশ্য একদিনে আসেনি। ২০১৬ সালে পর্তুগালের ইউরো জয়, ২০১৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ শিরোপা, ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয় কিংবা ২০২৩ সালে ম্যানচেস্টার সিটির ট্রেবল জয়ের গল্পে দলীয় সাফল্যের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে, লিওনেল মেসি এবং আর্লিং হলান্ডের নাম। অথচ এই সাফল্যের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী দল, দক্ষ কোচিং, দীর্ঘ পরিকল্পনা এবং প্রতিটি খেলোয়াড়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। একজন তারকা ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। কিন্তু শিরোপা জয়ের পথ তৈরি করে পুরো দল।
আধুনিক সম্প্রচার প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রবণতাকে আরও উসকে দিয়েছে। সম্প্রচারে সিনেমার মতো ক্যামেরা প্রায়ই একজন খেলোয়াড়কে অনুসরণ করে। ভিএআর, বদলি কিংবা পানি বিরতির সময়েও ক্যামেরা খুঁজে নেয় তারকাদের মুখ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ভিডিও, ভাইরাল মুহূর্ত এবং সার্চ ট্রেন্ডের কারণে একজন ফুটবলারের একটি গোল, একটি উদযাপন কিংবা একটি অভিব্যক্তিই অনেক সময় পুরো ম্যাচের চেয়ে বেশি আলোচিত হয়ে ওঠে। ফলে দলীয় কৌশল, পরিশ্রম এবং সম্মিলিত পারফরম্যান্স অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়।
ফুটবলের ইতিহাস অবশ্য ভিন্ন কথা বলে। ১৯৮৬ সালের আর্জেন্টিনা দলকে শুধু দিয়েগো ম্যারাডোনার দল বললে হোর্হে বুরুচাগা, সের্হিও বাতিস্তা এবং অস্কার রুগেরির অবদান আড়াল হয়ে যায়। একইভাবে ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের শিরোপা কিংবা ২০১৬ সালে পর্তুগালের ইউরো জয়ও কখনোই শুধু একজনের কীর্তি ছিল না। প্রতিটি সাফল্যের পেছনে ছিল একটি দলের বিশ্বাস, আত্মত্যাগ এবং একসঙ্গে লড়াই করার মানসিকতা।
তারকারা ফুটবলকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু একটি দলের সাফল্য কখনোই একজনের কাঁধে দাঁড়িয়ে আসে না। কোচের পরিকল্পনা, সতীর্থদের পরিশ্রম এবং দলগত বোঝাপড়াই শেষ পর্যন্ত শিরোপার ভিত্তি গড়ে দেয়। তাই বিশ্বকাপের গল্প শুধু একজন তারকার নয়, পুরো দলের।

স্পোর্টস ডেস্ক