নিজেদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম জয়ের খোঁজে সালাহরা
মরুর তপ্ত বালুকা আর নীল নদের শান্ত স্রোত পেরিয়ে আরও একবার বিশ্বমঞ্চের দামামা বাজিয়েছে মিশর। ফিফা বিশ্বকাপের গত আসরের এক বুক হতাশা ভুলে, এক সোনালী ফিনিক্স পাখির মতোই যেন ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠেছে মিশরীয় ফুটবল। রক্তক্ষয়ী কোনো যুদ্ধ নয়, বরং সবুজ গালিচায় বুটের জাদুতে এক অনবদ্য ও অপরাজিত মহাকাব্য লিখে তারা ছিনিয়ে এনেছে উত্তর আমেরিকা যাওয়ার টিকিট।
এ যেন কেবলই যোগ্যতা অর্জন নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে আফ্রিকা আর আরব বিশ্বের রাজদণ্ডটি নতুন করে পুনর্প্রতিষ্ঠা করার এক মহা আয়োজন। কোটি ভক্তের বিনিদ্র রজনীর স্বপ্ন আর প্রার্থনা পিঠে নিয়ে এই নতুন অভিযানের সেনাপতি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্বফুটবলের ধ্রুবতারা মোহাম্মেদ সালাহ। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে তরুণ তুর্কি ওমর মারমুশ, ত্রেজেগে আর মোস্তফা মোহাম্মদের মতো ক্ষিপ্রগতির একঝাঁক বাজপাখি, যাঁরা এবার বিশ্বমঞ্চে মিশরের ফুটবল ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে বদ্ধপরিকর।
ডাগআউটের বস হোসাম হাসান ও তাঁর রণকৌশল
খেলোয়াড়ি জীবনের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে হোসাম হাসান ছিলেন মিশরীয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলদাতা। বুটজোড়া তুলে রাখার পর পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন কোচিং। সেখানেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি। ডাগআউটে বসে নিখুঁত পরিকল্পনা করে দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা। ২০০৮ সালে ডাগআউটে যোগ দেওয়ার পর জামালেক, ইসমাইলি এবং আল মাসরির মতো বড় ক্লাবগুলোতে সফলতার সঙ্গে কোচিং করিয়েছেন তিনি।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পর্তুগিজ কোচ রুই ভিতোরিয়ার স্থলাভিষিক্ত হয়ে হাসান জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন। এরপর মিশরের ‘লড়াকু’ তকমাটিকে আরও শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। নিজের পরিকল্পনার দূরদর্শিতার প্রমাণ দিয়েছেন বাছাইপর্বে। এবার তার লক্ষ্য মূলমঞ্চে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়া।
বাছাইপর্বে অপরাজেয় মিশর
আফ্রিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে প্রতিপক্ষকে খড়কুটোর মতো উড়িয়েছেন মোহাম্মেদ সালাহরা। কোনো প্রতিপক্ষই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি তাদের সামনে। অপরাজিত থেকেই বাছাইপর্বের বাধা অতিক্রম করে মিশর। গত ৯১ বছরের মধ্যে এবারই তাদের এমন অপরাজিত থাকার রেকর্ড।
২০২৬ বিশ্বকাপে মিশরের ম্যাচ সূচি
বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে মিশরকে লড়তে হবে ইউরোপ, ওশেনিয়া ও এশিয়ার শক্তিশালী তিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। ১৫ জুন সিয়াটল স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচেই তাদের প্রতিপক্ষ ইউরোপের শক্তিশালী দেশ বেলজিয়াম। ২১ জুন ভ্যানকুভার বিসি প্লেসে তাদের প্রতিপক্ষ ওশেনিয়া অঞ্চলের নিউজিল্যান্ড। ২৬ জুন সিয়াটল স্টেডিয়ামে এশিয়ান দেশ ইরানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে গ্রুপ পর্ব শেষ করবে মিশর।
পজিশনভিত্তিক স্কোয়াড অ্যানালাইসিস
হোসাম হাসানের স্কোয়াডটি একঝাঁক নিয়মিত পারফর্ম করা তারকাদের নিয়ে গঠিত। যার নেতৃত্ব দেবেন লিভারপুলের মোহাম্মদ সালাহ এবং ম্যানচেস্টার সিটির ওমর মারমুশ।
অভিজ্ঞ মোহামেদ এল-শেনাওয়ি থাকছেন পোস্টের নিচে প্রথম গোলরক্ষক হিসেবে। বড় টুর্নামেন্টের চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে তার দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দলের ডিফেন্সকে আত্মবিশ্বাস জোগাবে।
ফরাসি ক্লাব নিসের তারকা মোহামেদ আবদেলমোনেম মিশরের রক্ষণভাগের মূল কাণ্ডারি। তার সঙ্গে আছেন মোহামেদ হানি, ইয়াসের ইব্রাহিমরা। বাছাইপর্বে ১০ ম্যাচে মাত্র ২টি গোল হজম করা মিশরের এই ডিফেন্স লাইন যেকোনো শক্তিশালী আক্রমণভাগকে আটকে দিতে সক্ষম।
মিশরের আক্রমণভাগ এবার দেশটির যেকোনো সময়ের অন্যতম সেরা। যেখানে লিভারপুলের মহাতারকা মোহাম্মেদ সালাহ এবং ম্যানচেস্টার সিটির ওমর মারমুশ জুটি প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের জন্য এক আতঙ্কের নাম হবে। বাছাইপর্বে একাই ৯টি গোল করে সালাহ ফর্মে থাকার জানান দিয়েছেন। মাঝমাঠ থেকে মারওয়ান আতিয়া এবং ইমাম আশুররা বল জোগান দেবেন এই বিধ্বংসী ফরোয়ার্ড লাইনকে।
স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা
সালাহের একক ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা মিশরের সবচেয়ে বড় শক্তি। বাছাইপর্বে ১০ ম্যাচে মাত্র ২টি গোল হজম করা তাদের ডিফেন্স লাইনকে আত্মবিশ্বাস যোগাবে। একই সঙ্গে দীর্ঘ ৯১ বছর পর বাছাইপর্বে অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপে আসায় দলটির আত্মবিশ্বাসে নতুন পারদ যোগ করবে।
তবে কিছুটা দুর্বলতাও রয়েছে। আক্রমণভাগে সালাহকে অতিরিক্ত মার্কিংয়ে আটকে রাখলে মিশরের গোল করার বিকল্প উৎসগুলো অনেক সময় খেই হারিয়ে ফেলে। যদিও ম্যানসিটির ফরোয়ার্ড মারমুশ জায়গা বের করতে পারলে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে, বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত খেলা ৭টি ম্যাচের একটিতেও জয়ের মুখ দেখেনি মিশর। এবার শক্তিশালী স্কোয়াড নিয়ে আসা দলটি প্রথম জয়ের জন্য কিছুটা চাপে থাকবে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রেকর্ড বুক
১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপে টিকিট কেটে প্রথম আফ্রিকান-আরব দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে খেলার ইতিহাস গড়ে মিশর। এটি দেশটির ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
স্মরণীয় যত রেকর্ড
সর্বোচ্চ গোলদাতা : বিশ্বকাপের ইতিহাসে মিশরের হয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডটি যৌথভাবে আবদেল রহমান ফাওজি (১৯৩৪) এবং মোহাম্মদ সালাহ (২০১৮)—এর দখলে রয়েছে। এই দুজনই ২টি করে গোল করেছেন। ২০২৬ আসরে সালাহের সামনে সুযোগ থাকছে এককভাবে শীর্ষে যাওয়ার।
নেদারল্যান্ডসকে রুখে দেওয়া : ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে তৎকালীন ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন নেদারল্যান্ডসকে ১-১ গোলে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপে তাদের প্রথম পয়েন্ট অর্জন করেছিল মিশর। যেখানে পেনাল্টি থেকে ঐতিহাসিক গোলটি করেছিলেন মাগদি আবদেল ঘানি।
সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড : মিশরের কোনো খেলোয়াড়ই বিশ্বকাপে ৩টির বেশি ম্যাচ খেলতে পারেননি, কারণ দলটির কোনো আসরেই গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হওয়া হয়নি।
২০২৬ বিশ্বকাপে লক্ষ্য
হোসাম হাসানের অধীনে নতুন ও লড়াকু মিশর দল এবার উত্তর আমেরিকার মাঠে নামছে। মোহাম্মদ সালাহর জাদুকরী ফর্ম আর নিরেট ডিফেন্সের ওপর ভর করে বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড ও ইরানের গ্রুপ থেকে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে পা রেখে নতুন ইতিহাস গড়ার লক্ষ্য নীল নদের দেশটির।
মিশরের বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলকিপার : মোহামেদ এল-শেনাওয়ি, মোস্তফা শোবেইব, এল-মাহদি সোলাইমান ও মোহামেদ আলা।
ডিফেন্ডার : মোহামেদ আবদেলমোনেম, মোহামেদ হানির, ইয়াসের ইব্রাহিম, হোসাম আবদেলমাজিদ, আহমেদ ফাত্তুহ, তারেক আলা, রামি রাবিয়া, হামদি ফাথি ও করিম হাফেজ।
মিডফিল্ডার : মারওয়ান আতিয়া, আহমেদ মোস্তাফা, মাহমুদ হাসান, ইমাম আশুর, মোস্তাফা আবদেল রউফ, মোহান্নাদ লাশিন, হাইথাম হাসান, মাহমুদ সাবের, ইব্রাহিম আদেল ও নাবিল এমাদ
ফরোয়ার্ড : মোহাম্মেদ সালাহ, ওমর মারমুশ ও হামজা আবদেল করিম।

স্পোর্টস ডেস্ক