বিনিয়োগে ঝুঁকি তবুও বিডি অটোকারসের দর লাগামহীন
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের দুর্বল প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অটোকারসের (বিডি অটোকারস) শেয়ারদর অস্বাভাবিকহারে বাড়ছে। মাত্র এক মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এই কোম্পানির শেয়ারদর কারণ ছাড়াই বেড়েছে ৮৬ টাকা। শেয়ারটির দর এতো বৃদ্ধির বিষয়টি ইতোমধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে সিকিউরিটিজ হাউজগুলোতে।
ডিএসইতে গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বাংলাদেশ অটোকারসের প্রতি শেয়ারের সমাপনী দর দাঁড়ায় ২২২ টাকা। আগের মাসের ১১ মার্চ শেয়ার দর ছিল ১৩৬ টাকা। গত এক মাস বা ২১ কর্মদিবসে ব্যবধানে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি দর বেড়েছে ৮৬ টাকা বা ৬৩ দশমিক ২৩ শতাংশ।
এছাড়া গতকাল বৃহস্পতিবার কোম্পানির মোট শেয়ারের মাধ্যমে বাজারে মূলধন দাঁড়ায় ৯৬ কোটি তিন লাখ ৭৪ হাজার ৮৮৬ টাকা। গত ১১ মার্চ বাজারে মূলধন ছিল ৫৮ কোটি ৮৩ লাখ ৩৭ হাজার ৭৬৮ টাকা। ২১ কর্মদিবসের ব্যবধানে মোট শেয়ারের মাধ্যমে বাজারে মূলধন বেড়েছে ৩৭ কোটি ২০ লাখ ৩৭ হাজার ১১৮ টাকা। কারণ নেই তবুও শেয়ার দর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে জানিয়ে বাংলাদেশ অটোকারসের শেয়ার ধারণ করা বিনিয়োগকারীরা বলছেন, গত ২১ কর্মদিবস ব্যবধানে শেয়ারটির দর বেড়েছে ৮৬ টাকা। মোট শেয়ারের বাজার মূলধন বেড়েছে ৩৭ কোটি টাকা।
শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি প্রসঙ্গে কোম্পানিটির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বিডি অটোকারসের শেয়ার দর কেন বাড়ছে, সেই বিষয়ে আমাদের তথ্য জানা নেই। শেয়ার দর বাড়ার মতো কোম্পানিটিতে এখন কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্যও নেই। অপরদিক শেয়ার দর বাড়ার কারণে গত ৩০ মার্চ কোম্পানিটিতে ডিএসই নোটিশ পাঠিয়েছিল। এর জবাবে চলতি বছরের গত ৩১ মার্চ কোম্পানিটি জানায়, কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই শেয়ার দর বাড়ছে। ওইদিন (৩১ মার্চ) শেয়ার দর ছিল ১৭৯ টাকা। পরে যেন শেয়ার দরের গতি আরও বেড়ে যায়। শেয়ার দর বেড়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দাঁড়ায় ২২২ টাকা। এই ধরনের দর বাড়ায় এই কোম্পানিতে বিনিয়োগ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তাই কোম্পানিটির শেয়ার দর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার কারণ খতিয়ে দেখতে রেগুলেটরদের বিশেষ অনুরোধ করেন বিনিয়োগকারীরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার ডিএসইতে কোম্পানিটির মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) দাঁড়ায় এক হাজার ২৩৩ পয়েন্টে। পিই রেশিও অনুসারে কোম্পানিতে বিনিয়োগ সম্পূর্ণ ঝুঁকিতে রয়েছে। পুঁজিবাজারের কোনো কোম্পানির পিই রেশিও যদি সিঙ্গেল ডিজিটে থাকে, তাহলে সেখানে বিনিয়োগ সম্পূর্ণ নিরাপদ ধরে নেওয়া হয়। এছাড়া পিই রেশিও ডিজিট যদি ১৫ পয়েন্ট পর্যন্ত অবস্থান করে, তবে সেখানেও বিনিয়োগ নিরাপদ বলে ধরা হয়ে থাকে। তবে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (বিএসইসি) মার্জিন ঋণের যোগ্যতা হিসাবে সর্বোচ্চ ৪০ পিই রেশিও বেঁধে দিয়েছে। সেই হিসেবে ৪০ পর্যন্ত পিইধারীর শেয়ার বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ বলে জানায় বিএসইসি। অর্থাৎ পিই রেশিও ৪০ এর ওপরে গেলে বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পিই রেশিও যত বাড়বে ঝুঁকির মাত্রা তত বাড়তে থাকবে।
কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২০২৬) দ্বিতীয় প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) আর্থিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ অটোকারসের শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে তিন পয়সা। আগের অর্থবছরের (২০২৪-২০২৫) একই সময়ে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল চার পয়সা। কোম্পানিটির চলতি অর্থবছরের দুই প্রান্তিকে (জুলাই-ডিসেম্বর) শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে পাঁচ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে (জুলাই-ডিসেম্বর) শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল ছয় পয়সা। আলোচিত অর্থবছরের দুই প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ হয়েছে ৫২ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ ছিল ৪৪ পয়সা। গত ৩১ ডিসেম্বর কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে সাত টাকা ৩৫ পয়সা।
এর আগে ২০২৪-২০২৫ সমাপ্ত অর্থবছরে (জুলাই-জুন) জন্য সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য দুই শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল। ওই অর্থবছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল ১৮ পয়সা। ওই সমাপ্ত অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ হয়েছিল নেগেটিভ ৬২ পয়সা। শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছিল সাত টাকা ৪৫ পয়সা।
১৯৮৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় বাংলাদেশ অটোকারস। বি ক্যাটাগরির এই কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ১০ কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন চার কোটি ৩২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। শেয়ার সংখ্যা ৪৩ লাখ ২৬ হাজার ১৩টি। রিজার্ভ নেগেটিভ এক কোটি ১০ লাখ টাকা। চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ৩০ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৪৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান