পুনরুদ্ধারে এসআইবিএলকে শেয়ারহোল্ডারদের দায়িত্বে দিন : রেজাউল হক
অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সমস্যায় পড়া পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) রয়েছে। এসআইবিএলকে অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত না করে এটাকে প্রকৃত উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব দিতে দাবি জানিয়েছেন ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তা পরিচালক ও সাবেক চেয়ারম্যান মেজর (অব.) ডা. রেজাউল হক।
আজ সোমবার (৩০ মার্চ) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান ডা. রেজাউল হক।
রেজাউল হক বলেন, শেয়ারহোল্ডাররা দায়িত্ব পেলে দ্রুত সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্বিক সহযোগিতায় সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক তার গ্রাহকের আস্থা পুনরায় ফিরিয়ে আনতে পারবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের আর্থিক দুরাবস্থা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাণিজ্যিকভাবে পুনরায় একটি লাভজনক ও সফল ব্যাংকে রূপান্তরিত হবে।
রেজাউল হক আরও বলেন, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে কতিপয় রুগ্ন ব্যাংকের সঙ্গে অযৌক্তিকভাবে একীভূত না করে প্রকৃত উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের পাশাপাশি প্রয়োজনে কিছু দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগকারীকে পরিচালনা পর্ষদে সম্পৃক্ত করে ব্যাংকটিকে যুক্তিযুক্ত উপায়ে প্রকৃত অর্থে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়াটাই হবে সময় উপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত।
সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল হক বলেন, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১৯৯৫ সালের ২২ নভেম্বর একটি দ্বিতীয় প্রজন্মের শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। যৌথ উদ্দ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকটি ২০০০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এই ব্যাংক কর্তৃক চালুকৃত ক্যাশ ওয়াকফ স্কিমটি পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ক্যাশ ওয়াকফ নামে পরিচিত। বর্তমানে দুটি সাব-সিডিয়ারি কোম্পানিসহ ব্যাংকটির ১৮১টি শাখা, ২৪০টি উপশাখা, ৩৭০টি এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা পরিচালনা করছে।
রেজাউল হক বলেন, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর তৎকালীন স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার নির্দেশে একটি সরকারি গোয়েন্দা বাহিনীর সহায়তায় অস্ত্রের মুখে মো. সাইফুল আলম (এস আলম) ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণে নেয়, যা ওই সময়ে দেশের স্বনামধন্য পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এস আলম কর্তৃক দখল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের সব শরীয়াহ ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বদা দ্বিতীয় ব্যাংক হিসেবে ছিল। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ২০১৭ সালে দখল হওয়ার পূর্বের বছরগুলোতে শেয়ারহোল্ডাদেরকে নিয়মিত নগদ লভ্যাংশ ও বোনাস শেয়ার প্রদান করে আসছিল। ব্যাংকের অগ্রগতি বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে শাখা খোলার জন্য অনুমোদন করেছিল৷
রেজাউল হক আরও বলেন, গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক অত্র ব্যাংকের এস আলম কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে ব্যাংকের প্রকৃত মালিকদের হাতে ফেরত না দিয়ে কোনো রকম আলোচনা ছাড়াই চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক ও একজন উদ্যোক্তা পরিচালকের সমন্বয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে, যা ছিল ব্যাংকটিকে আর্থিক দুরবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য একটি অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত। অধিকন্তু চেয়ারম্যান হিসেবে উদ্দ্যোক্তা পরিচালককে পাশ কাটিয়ে ব্যাংক পরিচালনায় অনভিজ্ঞ একজন স্বতন্ত্র পরিচালককে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়, যা ছিল একটি বাস্তবতা বর্হিভূত অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত। এতে অনেক উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডাদের পরিচালক হওয়ার যাবতীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এবং নতুন পরিচালনা পর্ষদে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বারংবার অনুরোধ করা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি আমলে নেয়নি। অধিকন্তু, গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে, প্রকৃত উদ্দ্যোক্তাদের ওপর ব্যাংকের পরিচালনার কার্যভার অর্পিত না হওয়ায় গ্রাহক অনাস্থা তৈরি হওয়ায় গ্রাহক ব্যাংক হতে তাদের সব ডিপোজিট তুলে নেওয়ায় ব্যাংকের দুরবস্থা আরও ঘনীভূত হয়। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যথেষ্ট অর্থের জোগান দেওয়া সত্বেও ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল হক বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক যাদেরকে পরিচালনা পর্ষদের দ্বায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তারা কেউই কোনো ব্যাংক পরিচালনার সঙ্গে পূর্বে যুক্ত ছিলেন না। ব্যাংকের পরিচালনার বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্বেও প্রায় দেড় বছর অনভিজ্ঞ পর্ষদ দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন প্রসাশন ব্যাংকটি পরিচালনা করে শুধু ক্ষতিগ্রস্তই করেনি, বরং ব্যাংকটিকে হত্যার উপক্রম করেছে।
রেজাউল হক বলেন, এসআইবিএলের প্রকৃত উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডার পরিচালক যাদের হাত থেকে অস্ত্রের মুখে ব্যাংকটি দখল করে নেওয়া হয়, তাদের সঙ্গে কোন রকম আলোচনা ছাড়াই বা তাদের হাতে ব্যাংকটি ফেরত না দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নরের একক সিদ্ধান্তে গত ৫ নভেম্বর ব্যাংকটিকে অকার্যকর ঘোষণা করে এবং হাজার হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারীর শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করে তাদেরকে পথে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক রেজুলেশন প্রক্রিয়ার অধীনে নেওয়া এই রকম হটকারী সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণরুপে বে-আইনি।
ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা জড়িত না জানিয়ে রেজাউল হক বলেন, ২০১৭ হতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত এস আলম কর্তৃক সংঘটিত ব্যাংক লুটপাটের দায় এই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপরে অন্যায়ভাবে চাপানো হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনোভাবেই এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। অন্যদিকে, ব্যাংকের হাজার হাজার আমানতকারীর গচ্ছিত টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হলেও আজ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত ব্যাবসায়ীরাও আজ ব্যাংকের সাপোর্টের অভাবে তাদের ব্যাবসা নিয়ে অস্তিত্বের হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। এমনকি বহু ব্যবসায়ী ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে শ্রেণিকৃত হওয়ায় এবং অন্য প্রতিষ্ঠান হতে ঋণ না পাওয়ায় তারা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।
রেজাউল হক আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই অ-সাংবিধানিক সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আমরা হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করি। ওই রিটে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ গত বছরের ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংককে চার সপ্তাহের সময় দিয়ে কতিপয় বিষয়ের জবাব চেয়ে রুল জারি করেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন প্রশাসন উক্ত রুলের জবাব না দিয়ে একতরফাভাবে এসআইবিএলকে মার্জার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে, যা আদালত অবমাননার শামিল। এমতাবস্থায় আমরা আবার আদালতের শরণাপন্ন হই। হাইকোর্ট বিভাগের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ উক্ত রুল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন, যা কার্য-তালিকায় পূর্ণাঙ্গ শুনানির জন্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিষয়টি হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন বিধায় আমরা ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় ও সংসদ সচিবালয়ে উক্ত রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে পাস না করার জন্য গত বছরের ১ মার্চ এক পত্রের মাধ্যমে অবহিত করা হয়। এ বিষয়ে আমরা রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা (অ্যাটর্নি জেনারেল), অর্থ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, আইন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সংসদ সচিবালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অত্র ব্যাংকটির বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা পরিচালকদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলাপ-আলোচনা ও বৈঠক না করেই অত্র ব্যাংকটিকে এস আলম দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও লুটকৃত কতিপয় রুগ্ন ব্যাংকের সঙ্গে অযৌক্তিকভাবে একীভূত করার চেষ্টা করছে, যা ব্যাংকের গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক