গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য আর কতকাল অপেক্ষায় থাকতে হবে
বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে ব্যক্তিগতভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন উল্লেখ করে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেছেন, প্রতিষ্ঠানগতভাবেও আমাদের সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকতে হয়েছে। শেখ হাসিনার আমলে স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ ভীষণ সংকুচিত করা হয়েছিল। সাংবাদিক ও সম্পাদকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, অনেককে জেলে যেতে হয়েছে।
গত রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের দ্বিতীয় দিনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিষয়ক নির্ধারিত বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) তিন দিনের ওই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে।
মতিউর রহমান বলেন, সেই স্বৈরাচারী শাসনকালে নানাভাবে প্রথম আলোর সার্কুলেশন কমানোর চেষ্টা চলেছে। অনেক সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হয়েছে। এমনকি ২০১৫ সালের আগস্টে ৫০টির মতো দেশি-বিদেশি বড় কোম্পানির বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আর সেটা করা হয়েছিল সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। ২০০০ সালেও আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের সরকারি বিজ্ঞাপন ও অনলাইন সংস্করণ বন্ধ করে দিয়েছিল।
২০২৩ সালের ৩০ মার্চ আমার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। একসময় আমার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল আশির কাছাকাছি। তার মধ্যে এখনো কিছু মামলা কোর্টে ঝুলে আছে।
আমাদের মনে আছে, সংসদে দাঁড়িয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, প্রথম আলো আওয়ামী লীগের শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু, দেশের শত্রু। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অফিস ও যেকোনো জাতীয় অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর সম্পাদক বা সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। ২০০১ সালে নির্বাচনে পরাজয়ের পর এবং ২০০৯ সালের পর যে কয়বার শেখ হাসিনার সঙ্গে যতটুকু দেখা হয়েছে, তখন তিনি শুধু বিদ্বেষমূলক কথা বলেই ক্ষান্ত হননি, আক্রমণাত্মক ভাষাও ব্যবহার করেছেন।
প্রথম আলোর সম্পাদক বলেন, আমি ৬৪ বছর আগের একটা ঘটনা স্মরণ করতে চাই। ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের শাসনের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়েছিল। সেদিনের অনেক দাবির মধ্যে একটি দাবি ছিল—কথা বলার অধিকার দিতে হবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিতে হবে। সেদিনের সে বিক্ষোভ ধর্মঘটে আমি ছিলাম একজন অংশগ্রহণকারী। তারপর লড়াই–সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বিগত ৫৫ বছর বহু উত্থান–পতনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক সরকার এসেছে, আবার চলেও গেছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক পটভূমিও পরিবর্তিত হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে দেশের বুকে চেপে থাকা এক স্বৈরাচারী শাসক ও স্বৈরতন্ত্রের পতন হয়েছে। স্বৈরশাসক দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। এটা একটা অবিশ্বাস্য ঘটনা ছিল। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় ১৮ মাস দেশ পরিচালনা করেছে। ওই অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেশবাসীর আশা ছিল অনেক। কিন্তু সরকার দেশের মানুষকে হতাশ করেছে।
এর ফলে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় ব্যর্থতার স্বাক্ষর বর্তমান সরকারও বহন করে চলেছে। রাজনৈতিক ও সংবিধান সংস্কারের কিছু উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা নেওয়া হলেও সেগুলো বেশি দূর এগোয়নি। কিছু কমিশনের কোনো প্রস্তাবই আলোর মুখ দেখেনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে সময় নানা চাপ বা ভয়ের মুখে কিছু সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা বদল হয়েছে, সম্পাদকও পরিবর্তন হয়েছে অনেক জায়গায়। অনেক কর্মরত সাংবাদিককে কাজ ছাড়তে হয়েছে।
এসব কারণে সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমে তখন অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। মালিকপক্ষ নতুন সরকারের প্রভাবশালীদের সঙ্গে সম্পর্ক করতে তাদের অনুসারীদের দায়িত্বে বসিয়েছে। এভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সংবাদপত্র বা পুরো প্রচারমাধ্যমকে বেশ কিছুটা অনিশ্চয়তার এবং স্বনিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে।
‘প্রথম আলোর অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, একটা ভয়ের পরিবেশের মধ্য দিয়ে আমরা গেছি’–উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরোটা সময়ই উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপ ও হুমকির মধ্য দিয়ে আমাদের কাজ করতে হয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। সরকারের ভেতরে-বাইরের নানা গোষ্ঠী নানামুখী তৎপরতা চালিয়েছে। দেশে একটা অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা ছিল তাদের।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে আমাদের প্রথম আলো অফিসের সামনে উগ্রবাদীরা প্রায় সাত দিন ধরে বিক্ষিপ্ত সমাবেশ করেছে, গরু জবাই করেছে। এসব প্রচার ও কার্যকলাপের চরম পরিণতি হলো প্রথম আলোর অফিস পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রায় সারারাত ধরে প্রথম আলোর অফিসে আগুন জ্বলেছে। লুটপাট হয়েছে। সম্পত্তি ধ্বংস করা হয়েছে। যখন সব আগুনে পুড়ে শেষ হয়েছে, তখনই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফায়ার সার্ভিসকে আসতে পথ করে দিয়েছে।
সরকারের যাঁরা এ বিষয়ে দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা পুলিশ, র্যাব বা সেনাসদস্যদের ধ্বংসযজ্ঞ রোধে কোনো সরাসরি শক্ত নির্দেশ দেননি। দু-একজন উপদেষ্টা তাঁদের মতো করে চেষ্টা করেছেন। তাতে কোনো কাজ হয়নি। রাত পেরিয়ে সকালের আলো ফোটার আগেই প্রথম আলো অফিসের আগুন ও ধ্বংসযজ্ঞ শেষ হয়ে যায়। প্রথম আলোর পর ডেইলি স্টার অফিসও অবরোধ করে রাখা হয়, আগুন দেওয়া হয়। বহু কষ্টে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় তাদের কর্মীদের বের করে আনা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে নানা রকম উৎসাহজনক কথাবার্তা বলা হলেও সংবাদমাধ্যম–জগতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে অন্তর্বর্তী সরকার একটি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। এই কমিশন বেশ পরিশ্রম করে জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব করেছিল।
এসব বিষয়ে সাংবাদিক, সম্পাদক ও পরিচালকদের মধ্যে সাধারণভাবে ইতিবাচক ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেগুলো বাস্তবায়নে সামান্যতম কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এই সবকিছুর পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে একটা ভালো নির্বাচন হয়েছে। সরকার, সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং প্রশাসন মিলিতভাবে একটা ভালো নির্বাচন সম্পন্ন করতে পেরেছে। এই সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি বিশাল বিজয় পেয়েছে। প্রায় ১৯ বছর পর তারা ক্ষমতায় এল।
প্রথম আলোর সম্পাদক বলেন, আমাদের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ কোন পথ বেছে নেবে? আরও নির্দিষ্টভাবে বললে—আমরা কীভাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করব, যেখানে একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম অবাধে কাজ করতে পারে?
বিএনপির বিগত দুই আমলের (১৯৯১–৯৬ এবং ২০০১–০৬) সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সেই সময়ে আমি ভোরের কাগজ ও প্রথম আলোর সম্পাদক ছিলাম। এই দুই মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময়ে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আমরা অধিক স্বাধীনতা ভোগ করেছি। বিশেষ করে ২০০১-০৬ সরকারের আমলে আমরা তাদের অনেক ভুল নীতি ও কার্যকলাপের কঠোর সমালোচনা করেছি। তাতে করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীসহ নেতাদের সঙ্গে আমাদের কথা বলা বন্ধ হয়নি কখনো। আমাদের বিরুদ্ধে বড় কোনো হয়রানি বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আমার মনে আছে, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার তর্ক হয়েছে। দুজনেই উত্তেজিত হয়ে কথা বলেছি। কিন্তু সে জন্য আমাকে কোনো শাস্তি পেতে হয়নি। সেই সময় তরুণ বিএনপি নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও আমার ঘরোয়াভাবে তর্ক হয়েছিল। এমনকি সংবাদপত্রের পাতায়ও আমাদের মধ্যে বিতর্ক হয়েছিল। সেই মতবিরোধগুলোর নিরসন ঘটে।
‘২০২৪ সালের শুরুর দিকে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রথম আলোর মালিকানা ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমাদের কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল’-উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই চাপ সৃষ্টির পেছনে আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল সম্পাদককে বাদ দেওয়া। প্রথম আলোর মালিকানা কেড়ে অত্যন্ত নিন্দিত ও দুর্নামগ্রস্ত একটি অর্থ পাচারকারী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে তা হস্তান্তর করার চিন্তা ছিল। এর সবকিছুই করা হয়েছিল শেখ হাসিনার নির্দেশে। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ওই সরকার আর অল্প কয়েক মাস ক্ষমতায় টিকে থাকলে প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা আমাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হতো। আমার পক্ষে এর সম্পাদক থাকা আর সম্ভব হতো না। সেসব ভয়ংকর দিন আমাদের মনে অমোচনীয় ক্ষত তৈরি করে রেখেছে।
স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বহুমুখী সংকট সৃষ্টিকারী সমস্যাগুলোর পর বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে আসায় আমাদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশেষ করে সংবাদপত্র বা প্রচারমাধ্যমের ব্যাপারে বিএনপির অতীতের ইতিবাচক কার্যক্রমের পটভূমিতে আমরা আশা করছি যে বর্তমান ক্রান্তিকালেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপি সরকার সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও প্রচারমাধ্যমের ব্যাপারে আগের মতো সহনশীল ও ইতিবাচক মনোভাব গ্রহণ করে চলবেন।
সংবাদমাধ্যম নিয়ে ৩১ দফা কর্মসূচি বা নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপির প্রতিশ্রুতি আমাদের মধ্যে আরও আশাবাদ তৈরি করেছে উল্লেখ করে প্রথম আলোর সম্পাদক বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আমাদের একাধিক বৈঠক ও খোলামেলা আলোচনায় সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। বিএনপির ৩১ দফা রাজনৈতিক কর্মসূচির ১১ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান ও সার্বিক সংস্কারের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে একটি মিডিয়া কমিশন গঠন করা হবে। সৎ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ‘গণমাধ্যম’ শিরোনামে বেশ আরও কিছু উদ্যোগের কথা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিএনপি নির্ভীক ও পক্ষপাতহীন সাংবাদিকতার সুরক্ষা ও স্বীকৃতি দেবে, বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনাকে স্বাগত জানাবে। তারা আরও বলেছে, সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং গঠনমূলক ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচকের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এসব লক্ষ্যে আইনি ব্যবস্থার সুযোগ তৈরি করা এবং সাংবাদিক নির্যাতনবিরোধী বিশেষ সেল গঠন করার কথাও আছে।
দল হিসেবে বিএনপি ও সরকারের এসব প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত সংবাদপত্র বা প্রচারমাধ্যমের সংস্কারের বিষয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, তথ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদপত্র নিরীক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং পুরোনো জমে থাকা বিল পরিশোধের ব্যাপারে আগ্রহের কথা বললেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। মিডিয়া কমিশন গঠন করে সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও প্রচারমাধ্যমজগতে পরিবর্তনের জরুরি কাজের বিষয়ে একটি মতবিনিময় বৈঠকের পর আর কিছু শোনা যায়নি।
বিগত মাসগুলোয় কিছু কিছু পত্রিকা ও টেলিভিশনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ ও পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে শোনা গেছে। অন্যদিকে কোনো কোনো সম্পাদক বা জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিকেরা বলছেন, তাঁদের কিছুটা অনিশ্চয়তা বা চাপের মধ্যে থাকতে হয় এবং সংবাদ ও মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বনিয়ন্ত্রণ বা অতিসতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। কোনো কোনো সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের ব্যাপারে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানা যায়।
এতে করে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কিছু প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য আলোচনা আমাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে পড়ছে। সরকার সাইবার সুরক্ষা আইন যেভাবে করছে, তাতে সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।
সরকার মাত্র সাত মাস সময় পার করেছে, হাতে আরও অনেক সময় আছে। এ কথা বিবেচনায় নিয়েও আমরা বলতে পারি যে দল ও সরকারের পক্ষ থেকে সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যম বিষয়ে জরুরি কাজগুলো বিএনপির শুরু করা দরকার। নইলে দেশে সাংবাদিক ও সম্পাদকদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সংকটে পড়বে। এমন এক অবস্থায় ৬৪ বছর আগের সেই ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ সালের কথা আমার বারবার মনে পড়ে যায়। সেদিন আমরা দাবি তুলেছিলাম, কথা বলার অধিকার দিতে হবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিতে হবে।
মতিউর রহমান বলেন, এই দীর্ঘ সময়ে সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক নেতার বদল হয়েছে, রাজনৈতিক পটভূমিরও পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আমাদের মূল দাবির বিষয়গুলো আগের জায়গাতেই স্থবির হয়ে আছে। আমার সাংবাদিকতার ৫৬ বছরের জীবনের শেষে এসে সেই একই জায়গায় থেকে যাচ্ছি। দুঃখের বিষয় হলো, সে দাবিতে এখনো আমাদের কথা বলতে হয়, দাবি জানাতে হয়। আমাদের আর কতকাল অপেক্ষায় থাকতে হবে?

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক