ঘটনাস্থলে না থেকেও হত্যা মামলায় আসামি সাংবাদিক
নওগাঁর বদলগাছীতে সরকারি অর্পিত (ভিপি) জমির দখল নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় ১৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন নিহত ব্যক্তির ছোট ভাই। মামলায় আসামি করা হয়েছে স্থানীয় এক সাংবাদিককেও। তবে সাংবাদিকের দাবি, সংঘর্ষের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। এমনকি মামলার বাদীও বলেছেন, ওই আসামিকে তিনি চেনেন না।
গত ১০ সেপ্টেম্বর বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের বারাতৈল গ্রামের খোর্দ্দ ভূবন গ্রামে ভিপি জমির দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ থেকে ১২ জন আহত হন। গুরুতর আহত মাসুদ রানা (৩৫) রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ সেপ্টেম্বর সকালে মারা যান।
মাসুদ রানা বালুভরা ইউনিয়নের আফজাল হোসেনের ছেলে। তার মৃত্যুর পর ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে বদলগাছী থানায় ১৫ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন তার ছোট ভাই রিফাত হোসেন।
মামলার ১৫ নম্বর আসামি করা হয়েছে টাইমস টুডে নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি ও দৈনিক জাতীয় অর্থনীতি পত্রিকার নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি রাসেল রানাকে। রাসেল রানার দাবি, সংঘর্ষের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। ঘটনাস্থল থেকে তার বাড়ির দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। বিভিন্ন সময়ে বালুভরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আল এমরানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় তাকে হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তাকে কেন মামলায় আসামি করা হয়েছে- এ প্রশ্নের জবাবে বাদী রিফাত হোসেন বলেন, মামলার ১৫ নম্বর আসামিকে আমি চিনি না।
ঘটনার সময় তার ভাইকে কারা মারধর করেছেন জানতে চাইলে রিফাত বলেন, আমার সামনেই আমার ভাইকে চারজন মিলে মারছিল। তাদের মধ্যে রাজা, জাহাঙ্গীর, কুদ্দুস ও ফটিক ছিল। আমি সাংবাদিক রাসেল রানাকে চিনি না।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা একজন সাংবাদিকের নাম হত্যা মামলায় কীভাবে এল- জানতে চাইলে রিফাত বলেন, আমাদের সঙ্গে বালুভরার এমরান চেয়ারম্যান ও আমার চাচা ভুট্টু ছিলেন। মামলায় তার নাম কে দিল, আমি জানি না।
বাদীর এমন বক্তব্যে মামলায় সাংবাদিককে আসামি করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে এবং সাংবাদিক রাসেল রানার দাবি, বালুভরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আল এমরানের নির্দেশেই তাকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। আগের সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আল এমরান বলেন, ভিপি জমি নিয়ে দুই পক্ষের মারামারি হয়েছে। উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছে। এর মধ্যে গুরুতর আহত হয়ে মাসুদ হোসেন মারা গেছে। সাংবাদিক রাসেল রানাকে আমার নির্দেশে মামলায় আসামি করা হয়েছে- এমন অভিযোগের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। কে কাকে আসামি করেছে, তা আমার জানা নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বারাতৈল গ্রামের খোর্দ্দ ভূবন গ্রামে প্রায় ১৪ বিঘা সরকারি অর্পিত জমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আসামিপক্ষের কয়েকজন কৃষক ওই জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ করে আসছিলেন। চলতি বছর নিহত মাসুদ রানা, তার বাবা আফজাল হোসেন ও ভাই রিফাত হোসেনের পক্ষ থেকেও জমি লিজ নেওয়ার আবেদন করা হয়। তবে এ বছর কোনো পক্ষই জমির লিজ পায়নি। পুরোনো চাষাবাদের সূত্রে আসামিপক্ষ জমিতে ফসল আবাদ করে আসছিল। পরে জমির দখল নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে জমিতে থাকা ফসল নষ্ট করার অভিযোগ ওঠে। এর জেরে ১০ সেপ্টেম্বর সকালে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
মামলার কয়েকজন আসামির বাড়িতে গিয়ে বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। তবে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, সংঘর্ষের সময় রাসেল রানা ঘটনাস্থলে ছিলেন না এবং তারা তাকে ব্যক্তিগতভাবেও চেনেন না।
বদলগাছী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। হত্যা মামলায় একজন সাংবাদিককে কীভাবে আসামি করা হলো- জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন। এ বিষয়ে বাদী ভালো বলতে পারবেন।
ওসি আরও বলেন, সাংবাদিক রাসেল রানার বিরুদ্ধে তদন্তে হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া গেলে চার্জশিটে তার নাম বাদ দেওয়া হতে পারে।

মিঠু হাসান, নওগাঁ (বদলগাছী-মহাদেবপুর)