১০ বছর ধরে সংস্কারহীন সড়ক, সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুপানি!
ভাঙা সড়ক, মোড়ে মোড়ে বিশাল খানাখন্দ আর সামান্য বৃষ্টিতেই দীর্ঘমেয়াদি হাঁটুপানি—নওগাঁ শহরের সিংহভাগ এলাকার নিত্যদিনের চিত্র এখন এটি। শহরের কোনো কোনো সড়কের বিটুমিন উঠে গেছে প্রায় এক দশক আগে, পরে বিছানো ইটের খোয়াও ক্ষয়ে গিয়ে সড়ক পরিণত হয়েছে কাদা-মাটির নালায়। ফলে অটোরিকশা, সিএনজি বা রিকশা চালকেরা এসব রুটে চলাচল করতে চান না। অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও মিলছে না যানবাহন। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী, গর্ভবতী নারী, শিক্ষার্থী ও বয়োজ্যেষ্ঠরা।
সম্প্রতি নওগাঁ পৌর এলাকার তাজের মোড়, কালীতলা, পালপাড়া, সুলতানপাড়া, গোস্তহাটির মোড়, উকিলপাড়া, চকবাড়িয়া ও দয়ালের মোড়সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে অবকাঠামোগত বেহাল দশা। অনেক সড়কের পিচ উঠে মাটির সঙ্গে মিশে তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত। বৃষ্টিতে গর্তগুলো পানিতে তলিয়ে থাকায় গভীরতা বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে প্রায়শই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত নওগাঁ পৌরসভা ১৯৮৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হয়। প্রায় ৩৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পৌরসভায় জনসংখ্যা প্রায় দুই লাখ। মোট ৩০০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ১৫০ কিলোমিটার পাকা, ৫০ কিলোমিটার আধাপাকা এবং ১০০ কিলোমিটার কাঁচা। পৌর কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করেছেন, এসব সড়কের প্রায় ৮০ শতাংশই এখন জরুরী সংস্কারের অপেক্ষায়।
জরুরি যাতায়াতের ক্ষেত্রে বেহাল সড়ক এখন মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। চকবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক ও গোস্তহাটির মোড়ের রিকশাচালক আব্দুল জলিল জানান, বর্ষায় ভোগান্তি শতগুণ বেড়ে যায়। পানির নিচে গর্ত না দেখে রিকশা নিয়ে চালকেরা নামলে যন্ত্রাংশ ভেঙে নষ্ট হয়। গর্ভবতী নারী বা মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যাওয়ার উপায় থাকে না।
সড়কের দুরবস্থায় স্থবির হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। শহরের প্রশিকা বিদ্যানিকেতনের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী হোসেন আলী আক্ষেপ করে বলে, বৃষ্টি হলেই স্কুলে যাওয়া যুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। রাস্তায় হাঁটু সমান কাদা-পানি জমে। গাড়ি পাওয়া যায় না, হেঁটে গেলে জামা-জুতা নষ্ট হয়ে যায়।
সিও অফিস এলাকার স্কুলশিক্ষিকা খাইরুন নাহার খুশি জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সড়কের বেহাল দশায় প্রতিদিন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সময়মতো পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সড়ক দুর্ভোগের সঙ্গে যোগ হয়েছে বর্জ্যে অবরুদ্ধ অপরিকল্পিত নালা বা ড্রেনেজ ব্যবস্থা। পানি নিষ্কাশনের গতি না থাকায় বৃষ্টির পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা জমে থাকছে পানি। ফলে চরম দুর্গন্ধ আর মশার উপদ্রবে বিষিয়ে উঠেছে জনজীবন।
একদিকে নাগরিক সেবার এই করুণ দশা, অন্যদিকে সম্প্রতি হোল্ডিং ট্যাক্স ও পানি বিল বৃদ্ধি করায় পৌরবাসীর মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সমাজকর্মী নাইস পারভিন প্রশ্ন তুলেছেন, পৌরকর বাড়ানো হলে সেই অনুপাতে মানসম্মত সড়ক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পথবাতির সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে না কেন?
পৌরকর বৃদ্ধির বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক ও বর্তমান পৌর প্রশাসক টি এম এ মমিন জানান, আইন অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পরপর কর পুনর্নির্ধারণ করতে হয়। তবে নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে পৌর অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে শহরের ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের কাজ চলমান রয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি ভাঙা সড়কগুলো সংস্কার এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল করা হবে।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ