শিল্পে গ্যাস সংকট কিছুটা কাটলেও বাসাবাড়িতে সরবরাহ অপ্রতুল
সাভারের তালবাগের বাসিন্দা লিপি আক্তার। স্বামী বেলায়েত হোসেন একটি বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক। সীমিত আয়ে চলা তিন সদস্যের পরিবারে মাস তিনেক ধরে নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত গ্যাস। বাধ্য হয়ে বাড়তি পাঁচ হাজার টাকায় বৈদুতিক ইন্ডাকশন চুলা কিনে কোনোমতে রান্নার কাজ সারছেন। তবে মাস শেষে গ্যাসের ডাবল বিল আর লাগামহীন বিদ্যুৎ বিল মিলিয়ে জ্বালানি খরচেই হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারটিকে।
লিপি আক্তারের এই দুর্বিষহ চিত্র এখন সাভার ও আশুলিয়ার ঘরে ঘরে। সরকারের নানা উদ্যোগে শিল্পে গ্যাসের চাপ কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও গৃহস্থালি সরবরাহ এখনও স্বাভাবিক হয়নি। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সাভার ও আশুলিয়া কার্যালয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়ে পাওয়া গেল সংকট ও অব্যবস্থাপনার ভিন্ন চিত্র। বাসাবাড়ি থেকে শিল্পকারখানা—সবত্রই চলছে গ্যাসের অবৈধ সংযোগের হিড়িক। এর ওপর আবার গ্যাসের কম চাপ দূর করতে বাসাবাড়িতে অবৈধ ‘গ্যাস বুস্টার’ ব্যবহারের কারণে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে।
তিতাস গ্যাসের একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮৬০ এমএমসিএফডি। এলএনজি আমদানি বৃদ্ধির পর সরবরাহ ২ হাজার ৬১০ এমএমসিএফডিতে পৌঁছালেও প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২৫০ এমএমসিএফডি (প্রায় ৩২ শতাংশ) ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট প্রায় ৩০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, যা আগে ছিল ১০ থেকে ১২ ডলার। ফলে উচ্চমূল্যে গ্যাস আমদানি করতে গিয়ে সরকারের ওপর ভর্তুকির চরম চাপ পড়ছে। আর এই চড়া দামের আমদানিকৃত গ্যাস চুরির মহোৎসব চলছে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে।
সাভার পৌর এলাকাসহ আশুলিয়ার কবীরপুর, জিরানি, ডেন্ডাবর, পলাশবাড়ী, কুড়গাঁও, জামগড়া, ভাদাইল এবং হেমায়েতপুর ও রাজফুলবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করে প্রতিদিন নতুন নতুন অবৈধ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। অসাধু ঠিকাদারদের মাধ্যমে স্থাপিত এসব মানহীন পাইপ যেকোনো সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
সাভার, মানিকগঞ্জ, আশুলিয়া ও গাজীপুর অঞ্চলের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও অনুসন্ধানে নিয়োজিত তিতাসের আঞ্চলিক ভিজিল্যান্স বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল আলীম রাসেল জানান, গত এক বছরে কেবল তার আওতাধীন এলাকা থেকেই শত কোটি টাকার গ্যাস চুরি উদ্ঘাটন করা হয়েছে। জোনাল কার্যালয়ে জব্দ করে রাখা হয়েছে লাখ লাখ ফুট অবৈধ পাইপ। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সীমিত জনবল নিয়ে দিনরাত চোরের পেছনে লেগে থেকেও চুরির প্রবণতা থামানো যাচ্ছে না। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনেকের নৈতিক মূল্যবোধ এতটা নিচে নেমেছে যে এক প্রান্তে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলে তারা অন্য প্রান্ত দিয়ে আবার সংযোগ নিচ্ছেন।’
তিতাস সাভার আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী মো. জাহাংগীর আলম বলেন, উচ্চমূল্যের গ্যাসের অপচয় ও চুরি রুখতে আমাদের অবস্থান কঠোর। চুরির পাশাপাশি গ্যাস বুস্টারের বিরুদ্ধেও আমরা টানা অভিযান পরিচালনা করছি।

জাহিদুর রহমান