আন্দোলন দমনে প্রত্যক্ষ উসকানি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যা, শেখ হাসিনার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে দমন-নিপীড়নে সহায়তা করা ও উসকানি দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি অভিযোগ আনা হয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) বেলা দেড়টার পর রায় ঘোষণা করবেন আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যর বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করবেন। ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এ মামলায় হাসানুল হক ইনু একমাত্র আসামি।
মামলা দশজন সাক্ষী তাদের জবানবন্দিতে ইনুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, উসকানি ও হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন।
হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আবদুল্লাহ-আল-মামুন নামের এক কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনালের জবানবন্দিতে বলেন, মামলার তদন্তকালে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংক্রান্ত প্রকাশিত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিটিভি, মিরর নাউ, মিরর নিউজ, আরটিভি, চ্যানেল২৪, এমটিভিসহ ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করি। ঘটনাকালীন সময়ে স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশিত ও সম্প্রচারিত ভিডিওচিত্র ও পত্রপত্রিকা সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করি। তদন্ত সংস্থার সংরক্ষিত ঘটনাকালীন নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আদেশ, নির্দেশ, উসকানিমূলক বক্তব্য ও বিবৃতি, লিফলেট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত পোস্ট এবং মন্তব্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করি। ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ঘটনার সঙ্গে কতিপয় ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক নেতার প্রত্যক্ষ উসকানি ও সম্পৃক্ততা ছিল, যা সাধারণ ছাত্র-জনতার যৌক্তিক আন্দোলন দমনে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ।
আরও পড়ুন : পুলিশ নির্বিচারে গুলি, অস্ত্র নিয়ে চড়াও হয় আওয়ামী ক্যাডাররা
মামলার এজাহার সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহতের ঘটনা এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে কলরেকর্ডের কথোপকথনের অডিওতে আন্দোলনকারীদের দমন-নিপীড়ন ও হত্যায় উসকানি দিয়ে ষড়যন্ত্র, সহায়তার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ মামলার তদন্ত শুরু হয়। ওই বছর ১১ সেপ্টেম্বর মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পরে গত বছরের ২ নভেম্বর এ মামলায় অভিযোগ (চার্জ) গঠন করে তার বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ইনুর বিরুদ্ধে আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— নিজের নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় উসকানি দেওয়া, শেখ হাসিনার সঙ্গে থেকে আন্দোলনকারীদের দমনে গুলির নির্দেশ দেওয়া, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের গুলির নির্দেশ দেওয়া ইত্যাদি।
আরও পড়ুন : প্রভাবশালী ব্যক্তির নির্দেশ ও উসকানিতে গুলিবর্ষণে হত্যাকাণ্ড
এ মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষে দশজন এবং আসামিপক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষ্য দেন। চলতি বছর ১৩ এপ্রিল যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়ে ১৩ মে শেষ হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন— শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য মতে, মামলাটির তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ৩ মার্চ। পরে তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করেন। ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চার্জ গঠন করা হয়। চলতি বছরের ১৩ মে যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়।
আরও পড়ুন : চোখের সামনেই সহপাঠী ও সাধারণ মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ে
এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, প্রসিকিউটর আব্দুস সাত্তার তরাফদার, প্রসিকিউটর মীজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর ফারুক আহমেদ, প্রসিকিউটর আব্দুস সাত্তার পালোয়ান প্রমুখ। অপরদিকে হাসানুল হক ইনুর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী ও নাজনীন আহসান।

নিজস্ব প্রতিবেদক