মায়ের লাশ পেতে কান ধরে ওঠবস করলেন ছেলে
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে এক রোগীর মৃত্যু ঘিরে রোগীর স্বজন ও চিকিৎসকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। স্বজনদের দাবি, সময়মতো অক্সিজেন না দেওয়ায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে চিকিৎসকদের অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ স্বজনরা দায়িত্বরত চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালান। গতকাল শনিবার (১৩ জুন) এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনার প্রতিবাদে চিকিৎসকরা মৃত রোগীর মরদেহ আটকে রাখেন এবং প্রায় তিন ঘণ্টা জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ রাখেন। পরে মৃতের ছেলে রিফাত হোসেনকে বাসা থেকে ডেকে এনে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ের একটি কক্ষে কান ধরে ওঠবস করানোর পর মায়ের মরদেহ তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
স্বজন ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১২ জুন) দিনগত রাত আড়াইটার দিকে রংপুর নগরীর নিউ জুম্মাপাড়া মহল্লার বাসিন্দা মাহবুব রহমানের স্ত্রী নুরজাহান বেগম (৫৫) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছেলে রিফাত হোসেন তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকদের কাছে রোগীকে দ্রুত অক্সিজেন দেওয়ার অনুরোধ জানানো হলে আগে ভর্তি-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এসময় রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং রাত ৪টার দিকে তিনি মারা যান।
চিকিৎসকদের অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ স্বজনরা দায়িত্বরত চিকিৎসকদের ওপর হামলা করেন। এরপর মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়। সকাল থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত জরুরি বিভাগ বন্ধ রেখে চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করেন। তাদের দাবি ছিল, রিফাত হোসেনকে হাসপাতালে এসে ক্ষমা চাইতে হবে, এরপরই মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। পরে প্রায় ১১ ঘণ্টা পর বিকেল ৩টার দিকে রিফাত হাসপাতালে এলে তাকে একটি কক্ষে নিয়ে কান ধরে ১০ বার ওঠবস করানো হয়। এরপর তার মায়ের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মৃত নুরজাহান বেগমের বড় ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টু জানান, স্ত্রীর কাছ থেকে মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে হাসপাতালে এসে তিনি উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখতে পান। সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের মায়ের মরদেহ আটকে রাখা হয়। এমনকি অ্যাম্বুলেন্সে তোলার পরও মরদেহ নামিয়ে নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময়েও মরদেহ না পাওয়ায় দুপুর দেড়টার দিকে মেডিক্যাল মোড় এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্বজনরা।
প্রত্যক্ষদর্শী, ইন্টার্ন চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মায়ের মৃত্যুর পর কর্তব্যরত সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. রাকিবুল হাসান ও ইন্টার্ন চিকিৎসক নাঈমের সঙ্গে রিফাত হোসেনের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ভোর থেকেই কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক হাসপাতালের ডেড হাউসের সামনে অবস্থান নেন। তারা অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত মরদেহ হস্তান্তর না করার ঘোষণা দেন। সকাল ১০টা থেকে হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে চিকিৎসকরা জরুরি বিভাগে তালা দিয়ে কর্মবিরতি শুরু করেন। এসময় কয়েক দফায় মরদেহ নিতে গিয়ে ব্যর্থ হন স্বজনরা। পরে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে মর্গের সামনে এলে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আশিকুর রহমান ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে চিকিৎসকদের মরদেহ হস্তান্তরের অনুরোধ জানান। তবে তাতেও তারা রাজি হননি। এমনকি অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ তোলার সময়ও বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
রংপুর ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মিরাজ বলেন, আমরা সকাল থেকেই বলে আসছিলাম, মরদেহ নিয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। তবে যে ব্যক্তি চিকিৎসকদের ওপর হামলা করেছে তাকে এখানে আসতে হবে। যেহেতু আমাদের দাবি ছিল তাকে আইনের আওতায় আনা, তাই তার আগে মরদেহ নিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। পরে অভিযুক্ত ছেলে এসে কান ধরে ওঠবস করে ক্ষমা চাওয়ার পর মরদেহ নিয়ে গেছে।
নুরজাহান বেগমের ভাগনে আব্দুস সালাম ও স্বজন শাওন বলেন, আমরা বারবার আকুতি করেছি। তারপরও মরদেহ নিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি। আমরা বলেছি, আগে দাফন করি, পরে তার ছেলেকে নিয়ে এসে ক্ষমা চাইব। কিন্তু চিকিৎসকরা তা মানেননি। উল্টো ১১ ঘণ্টা মরদেহ আটকে রেখেছেন। শেষ পর্যন্ত উপায় না পেয়ে মৃতের ছেলে এসে কান ধরে ওঠবস করে মায়ের মরদেহ নিয়ে গেছে। এটি অমানবিক ও জুলুম।
আব্দুস সালাম আরও বলেন, চিকিৎসকের ওপর হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ দেখলেই সব প্রমাণ হয়ে যাবে। অক্সিজেন না দেওয়ায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ছেলের সঙ্গে চিকিৎসকদের কথা-কাটাকাটি হয়েছে, কিন্তু হামলার ঘটনা ঘটেনি। চিকিৎসকদের অবহেলা ছিল বলেই হয়তো ছেলে উত্তেজিত হয়েছিল। এ বিষয়ে আমরা থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দিইনি।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আশিকুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। রোগীকে হাসপাতালে আনার পরপরই মৃত্যু হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দায়িত্বরত চিকিৎসকদের কোনো গাফিলতি ছিল না। কোনো কারণ ছাড়াই চিকিৎসক নাঈম, রাকিবসহ অন্যদের মারধরের চেষ্টা করা হয়। এমনকি দায়িত্বরত নার্সের সঙ্গেও অশোভন আচরণ করা হয়েছে। রোগীর স্বজনদের এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মৃতের ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে মরদেহ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আশিকুর রহমান বলেন, এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা।

এ কে এম মঈনুল হক, রংপুর