সাতক্ষীরায় আমচাষিদের মুখে নেই হাসি
সাতক্ষীরার আমবাগানগুলোয় গাছে গাছে ঝুলছে পাকা আম, বাগানে চলছে সংগ্রহ, বাছাই ও বাজারজাতকরণের ব্যস্ততা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রমিকদের পদচারণায় মুখর আমের মোকাম। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেও চাষিদের মুখে নেই স্বস্তির হাসি। ফলন ভালো হলেও লাভের অঙ্ক ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে।
চাষিদের অভিযোগ, এখন আম উৎপাদনের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাজারজাতকরণ। এক মণ আম বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাচ্ছে, তার বড় অংশ চলে যাচ্ছে ক্যারেট, বস্তা, কাগজ, শ্রমিক মজুরি ও পরিবহণ খরচে। ফলে ভরা মৌসুমেও অনেক কৃষক কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় প্রায় চার হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন। এ জেলার আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
বর্তমানে জেলার বিভিন্ন পাইকারি বাজারে জাত ও মানভেদে প্রতি মণ আম বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায়। কিন্তু এক মণ আম ঢাকায় পাঠাতে প্যাকিং ও পরিবহণ খরচ মিলিয়ে ব্যয় হচ্ছে প্রায় এক হাজার ৩০০ টাকা।
চাষিদের হিসাবে, শুধু একটি প্লাস্টিকের ক্যারেট কিনতেই খরচ হচ্ছে প্রায় ২৮০ টাকা। প্লাস্টিকের বস্তা ৩০ টাকা, পুরোনো পত্রিকার কাগজের কেজি ৭০ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে প্যাকেটজাতকরণে শ্রমিক মজুরি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়।
অন্যদিকে কুরিয়ার সার্ভিসে ঢাকায় আম পাঠাতে প্রতি কেজিতে ১৩ থেকে ১৭ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। হোম ডেলিভারি নিতে হলে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে প্রতি কেজিতে প্রায় ২৫-৩০ টাকা। ফলে ঢাকায় সরাসরি ক্রেতার কাছে আম পৌঁছে দিতে গিয়ে চাষি ও ব্যবসায়ীদের বড় অঙ্কের খরচ গুনতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার আমচাষি ইকবাল হোসেন বলেন, বছরজুড়ে বাগানের পরিচর্যা, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ বহন করি। কিন্তু মৌসুমে এসে দেখি আমের দাম কম, আর প্যাকেজিং খরচ আকাশছোঁয়া। এক মণ আম বিক্রি করে যে টাকা পাই, তার বড় অংশই ক্যারেট, বস্তা, কাগজ ও পরিবহনে চলে যাচ্ছে। লাভ বলতে তেমন কিছুই থাকে না।
আরেক আমচাষি আব্দুর রাজ্জাক জানান, আমের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারদর আশানুরূপ নয়। বর্তমানে এক মণ আম এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ ঢাকায় পাঠাতে গেলে প্যাকেজিং ও পরিবহণ খরচও প্রায় একই পরিমাণ হয়ে যাচ্ছে। এতে অনেক চাষি সরাসরি বাজারে কমদামে আম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্যাকেজিং উপকরণের দাম গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে প্লাস্টিক পণ্য, কাগজ এবং পরিবহণ ব্যয়ের প্রভাব সরাসরি পড়ছে আমের বাজারে।
সুলতানপুর বড় বাজারের আমের আড়তদার মো. রাজু জানান, আমের বাজার এখন পুরোপুরি ক্রেতানির্ভর। সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমে গেছে। কিন্তু ক্যারেট, বস্তা, কাগজ ও কুরিয়ার খরচ কমেনি, বরং বেড়েছে। তেলের দাম বাড়ায় ট্রাক ভাড়াও বেড়েছে। ফলে যেসব পাইকারি ক্রেতা আম কিনছেন তারাও পরিবহণের হিসাব করে আমের দাম কম বলছেন। এতে ব্যবসায়ী ও চাষি, দুই পক্ষই চাপে রয়েছে।
একই বাজারের আরেক আড়তদার নাজমুল হোসেন বলেন, আগে যে খরচে দুই মণ আম প্যাকেজিং করা যেত, এখন প্রায় সেই খরচ এক মণ আমে লাগছে। বিশেষ করে ক্যারেটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ফলে অনলাইনে বা কুরিয়ারে আম পাঠিয়ে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নাজমুল হোসেন বলেন, ঢাকায় যারা পাইকারি আম কিনছেন তারাও ক্যারেটসহ প্যাকেজিং ও পরিবহণের হিসাব করে আম কিনছেন। এ ছাড়া এবার ফলনও বেশি, ঈদের কারণে ছয় দিন বাজার বন্ধ ছিল। অনেক গাছে আম পেকে যাচ্ছে। চাষিরা একযোগে আম বাজারে তুলছে, ফলে আমের দাম কমে গেছে।
প্লাস্টিরে ক্যারেট ব্যবসায়ী আতিয়ার রহমান বলেন, সারা বছর ফলের দোকান থেকে দু-চারটা করে ক্যারেট কিনে জমিয়ে রাখি আমের মৌসুমে একটু লাভের আশায়। তবে অন্যবার দাম কিছুটা কম ছিল। এবার প্রতিটি ক্যারেটের দাম ১০০ টাকারও বেশি বেড়েছে। আমরা নিজেরাও বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছি।
বড় বাজারের বস্তা ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম বলেন, আগে যে প্লাস্টিকের বস্তা আমরা ১০ টাকায় বিক্রি করতাম, এবার সেটি ৩০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। কারণ ফ্যাক্টরি থেকে পাইকারি দাম ও পরিবহণ ব্যয় দুটোই বেড়েছে। তাই খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাতক্ষীরা শাখার একটি কুরিয়ার সার্ভিস ম্যানেজার বলেন, জ্বালানি, পরিবহণ ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কুরিয়ার চার্জ সমন্বয় করতে হয়েছে। বর্তমানে ঢাকায় আম পাঠাতে প্রতি কেজিতে ১৩ থেকে ১৬ টাকা খরচ হচ্ছে। আবার বাসা পর্যন্ত হোম ডেলিভারি দিতে হলে অতিরিক্ত খরচ যোগ হয়। ফলে ভাড়া আগের তুলনায় বেশি মনে হলেও বাস্তবে পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নির্ধারণ করা হয়েছে।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সালেহ মোহাম্মাদ আবদুল্লাহ বলেন, অনলাইন বিপণন, সমবায়ভিত্তিক বাজারজাতকরণ এবং সরাসরি বিক্রয় ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে কৃষক লাভবান হবে। পাশাপাশি প্যাকিং ও পরিবহণ খরচ কমানোর উদ্যোগও প্রয়োজন।

কে এম আনিছুর রহমান, সাতক্ষীরা (সদর, কলারোয়া, তালা ও ভোমরা স্থলবন্দর)