গ্রাহকের সাড়ে ৪ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা সমবায় সংস্থা
নওগাঁয় ‘উদয়ের পথে মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ নামের একটি বেসরকারি সমবায় সংস্থা তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে গ্রাহকদের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঈদুল আজহার ছুটির মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে চরম দুশ্চিন্তা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন কয়েক শত আমানতকারী।
ঘটনার পর থেকে সংস্থার পরিচালক আসাদুজ্জামান টিটু ও সহকারী ম্যানেজার মাসুদ রানা বিদ্যুৎসহ ছয় সদস্যবিশিষ্ট কমিটির সদস্যরা গা ঢাকা দিয়েছেন। প্রতিদিন প্রতারিত গ্রাহকেরা সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে কাউকে না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসছেন। ভুক্তভোগীরা তাদের কষ্টার্জিত টাকা ফেরত পেতে দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
নওগাঁ সদর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের ধামকুড়ি গ্রামে অবস্থিত এই সংস্থাটি সমবায় বিভাগ থেকে নিবন্ধিত। ২০১০ সালের জুলাই মাস থেকে সংস্থার পরিচালক আসাদুজ্জামান টিটু ও সহকারী ম্যানেজার মাসুদ রানাসহ ১০ জন মিলে সঞ্চয়, ডিপিএস ও আমানতের টাকা সংগ্রহ শুরু করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের প্রতি লাখে দুই হাজার টাকা মুনাফা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আমানত রাখতে উদ্বুদ্ধ করা হতো। অধিক মুনাফার লোভে পড়ে কেউ মেয়ের বিয়ে, কেউ সন্তানের পড়াশোনা, আবার কেউ বাড়ি তৈরির জন্য তাদের জীবনের সব সঞ্চয় এই সংস্থায় জমা রেখেছিলেন। বর্তমানে ৫৩০ জন নারী-পুরুষ গ্রাহকের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা নিয়ে সংস্থাটি লাপাত্তা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ধামকুড়ি গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ফল ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান জানান, অসুস্থ প্রতিবন্ধী স্ত্রীকে নিয়ে তিনি টিনের ঘরে থাকেন। বিশ্বাসের ওপর ভর করে কর্মজীবনের সব সঞ্চয় ৩ লাখ টাকা ৫ বছর আগে এই সংস্থায় রেখেছিলেন বাড়ি করার আশায়। শুরুতে লাভ দিলেও পরে টালবাহানা শুরু হয় এবং এখন সংস্থাটি পালিয়ে যাওয়ায় তিনি সস্ত্রীক পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। অর্থের অভাবে স্ত্রীর চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।
একই গ্রামের গার্মেন্টস কর্মী সীমা আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, সংস্থার পরিচালক আসাদুজ্জামান টিটু তার শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষককে বিশ্বাস করে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ২ লাখ টাকা রেখেছিলেন, কিন্তু এভাবে প্রতারিত হবেন তা ভাবেননি।
ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত গৃহবধূ মারুফা বিবি জানান, ৭ বছর আগে তিনি ৭০ হাজার টাকা রেখেছিলেন। অসুস্থ হওয়ার পর টাকা তুলতে গেলে তাকে গালিগালাজ করা হয়। পরে তার স্বামীকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হলেও বাকি টাকা না দিয়েই তারা পালিয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম জানান, শুরুতে কার্যক্রম ভালো চললেও করোনা মহামারির পর থেকে সংস্থার পরিসর ছোট হতে থাকে। মাঠ থেকে টাকা সংগ্রহ করা হলেও গ্রাহকদের কোনো ঋণ বা লভ্যাংশ দেওয়া হতো না। এ নিয়ে গ্রামে গ্রাহকদের সঙ্গে একটি বৈঠকও হয়েছিল, যেখানে এক বছর লাভ না দিয়ে পর্যায়ক্রমে আসল টাকা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রাহকেরা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি না রেখেই তারা গা ঢাকা দিয়েছে।
গতকাল বুধবার (৩ জুন) ধামকুড়ি গ্রামে গিয়ে সংস্থাটির কার্যালয় তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া পরিচালক আসাদুজ্জামান টিটু ও সহকারী ম্যানেজার মাসুদ রানা বিদ্যুতের বাড়িতে গিয়েও কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নওগাঁ সদর উপজেলা সমবায় অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চলতি বছর ওই সংস্থায় একটি অডিট করা হলেও তারা কোনো কাগজপত্র দাখিল করেনি। পরবর্তীতে গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে সংস্থাটির কার্যক্রম বাতিল করতে গত ২০ মে জেলা সমবায় অফিস থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়, যার কোনো জবাব তারা দেয়নি। সম্প্রতি লোকমুখে শুনেছি ঈদের ছুটির মধ্যে সংস্থাটি পালিয়ে গেছে। এতে ওই এলাকার প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমরা ভুক্তভোগীদের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।
নওগাঁ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, এ ঘটনায় এখনও থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ