রূপপুরে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন, আগস্টে মিলবে বিদ্যুৎ
দীর্ঘ ৬৫ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহে এই কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
গত ২৮ এপ্রিল থেকে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টর কোরে ১৬৩টি জ্বালানি অ্যাসেম্বলি স্থাপনের কাজ শুরু হয়, যা গতকাল মঙ্গলবার (১২ মে) শেষ হয়েছে। রাশিয়ান বিশেষ প্রযুক্তির ‘ইউরেনিয়াম-২৩৫’ এই কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এটি অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর একটি প্রক্রিয়া। ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপনের মাধ্যমে কেন্দ্রটি এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার পথে।
রূপপুর প্রকল্পের পরিচালক ও অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট আলেক্সি ডেইরি বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তা মান বজায় রেখেই জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন করা হয়েছে। খুব শিগগিরই রিঅ্যাক্টরকে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যায়ে নেওয়া হবে। পরে ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানো হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় গ্রিডে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতে পারে। পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে আরও ৮ থেকে ১০ মাস। একটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে।
রূপপুর প্রকল্পের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এখানে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ইউরেনিয়াম-২৩৫। রাশিয়া থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় এই জ্বালানি আনা হয়েছে। ছোট ছোট ইউরেনিয়াম পেলেট বিশেষ টিউবের ভেতরে ভরে ফুয়েল রড তৈরি করা হয়। পরে এসব রড একত্রে ফুয়েল অ্যাসেম্বলিতে রূপ নেয়।
এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে পাবনা জেলার জন্য আলাদাভাবে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. ফোরকান রেজা বাদশা বিশ্বাস বলেন, পাবনার জন্য আলাদা বিদ্যুৎ বরাদ্দ থাকলে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে।
রূপপুরের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, একসময় ভাবতেই পারিনি এখানে এত বড় প্রকল্প হবে। এখন পুরো এলাকা আলো ঝলমলে হয়ে গেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুস সামাদ বলেন, রাশিয়ান কর্মীদের কারণে এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন এসেছে।
গার্মেন্টস দোকানের কর্মী আলেয়া খাতুন জানান, রাশিয়ানদের চাহিদা অনুযায়ী পোশাক তৈরি ও বিক্রি করছেন তারা।
এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা তেজারত আলী বলেন, একসময় এখানে জঙ্গল ছিল। এখন পুরো এলাকা আধুনিক শহরের মতো হয়ে গেছে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান জানান, কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে ৫২ জন বিশেষজ্ঞ লাইসেন্স পেয়েছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২৪টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারও স্থাপন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা রয়েছে। দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর সমন্বয়ে গঠিত এ কেন্দ্রের দুই ইউনিট পূর্ণ উৎপাদনে গেলে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

এ বি এম ফজলুর রহমান, পাবনা