আঙুর চাষে তাক লাগালেন কামরুজ্জামান
চাঁদপুরের মাটিতে একসময় আঙুর চাষ ছিল প্রায় কল্পনার মতো বিষয়। দেশের আবহাওয়া ও মাটিতে এই বিদেশি ফল সফল হবে কি না, তা নিয়েই ছিল নানা সংশয়। কিন্তু সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জে পরিণত করে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলেছেন এক তরুণ উদ্যোক্তা কামরুজ্জামান প্রধানিয়া।
চাঁদপুর সদর উপজেলার চাঁদপুর-মতলব পেন্নাই সড়কের কালিভাঙতি এলাকায় গড়ে ওঠা তার ‘প্রধানিয়া এগ্রো’ বাগান এখন স্থানীয়দের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। বাঁশের মাচার ওপর সারি সারি লতা আর থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা সবুজ আঙুর দেখে মনে হয়, যেন বিদেশের কোনো আঙুর বাগান চলে এসেছে গ্রামবাংলায়।
তবে এই সাফল্যের শুরুটা সহজ ছিল না। শখ থেকেই আঙুর চাষের পরিকল্পনা করেন কামরুজ্জামান। প্রথমে অনেকেই বলেছিলেন বাংলাদেশে আঙুর চাষ সম্ভব নয়। কিন্তু এসব নেতিবাচক কথাকে তিনি থেমে যাওয়ার কারণ না বানিয়ে বরং এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হিসেবে নেন।
মাত্র ২০ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে আঙুর চাষ শুরু করেন তিনি। শুরুতে আবহাওয়া, মাটি ও পরিচর্যা- সবকিছুই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ধৈর্য, পরিশ্রম ও নিয়মিত গবেষণার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সফলতা আসে। বিদেশ থেকে উন্নত জাতের চারা এনে দেশের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়াটাও ছিল কঠিন কাজ, তবে তিনি হাল ছাড়েননি।
বর্তমানে তার একটি বাগান ছাড়াও আরও দুটি প্রজেক্টে আঙুর চাষ চলছে। তার সংগ্রহে রয়েছে বিশ্বের ১৮টি দেশের প্রায় ৮৫টি জাতের আঙুর গাছ, যা দেশের কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য এক অনন্য উদাহরণ।
সফলতার ফলে ইতোমধ্যে আঙুর বাজারজাত শুরু করেছেন তিনি। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায়ও যাচ্ছে তার উৎপাদিত আঙুর। প্রতিদিনই বাগান দেখতে ভিড় করছেন চাঁদপুরসহ আশপাশের জেলার মানুষ- কেউ শখে, কেউ শেখার আগ্রহে, আবার কেউ অনুপ্রেরণা নিতে।
কামরুজ্জামান প্রধানিয়া বলেন, করোনার সময় অবসর থেকে শখের বশে আঙুর চাষ শুরু করি। প্রথমে ছাদবাগান দিয়ে শুরু করি। ভালো ফলন দেখে পরে মাঠে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করি। এখন আমাদের তিনটি প্রজেক্টে আঙুর চাষ চলছে এবং ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
কামরুজ্জামান প্রধানিয়া আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো আঙুর চাষ সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা নিজেরা চারা উৎপাদন করি এবং তা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করি। নতুন উদ্যোক্তারা চাইলে আমাদের কাছ থেকে চারা নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করতে পারেন।
বাগান ঘুরে দেখা নাজমুল ইসলাম বলেন, ভিডিওতে দেখেছিলাম, বাস্তবে এসে আরও ভালো লাগছে। এত সুন্দর আঙুর বাগান আগে কখনও দেখিনি। আমি অনুপ্রাণিত হয়ে ছাদে আঙুর চাষ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
চাষাবাদের ফলন সম্পর্কে উদ্যোক্তা জানান, গত বছর ছোট পরিসরে প্রায় ৭০–৮০ কেজি আঙুর বিক্রি হয়েছিল। এবার উৎপাদন বেড়ে প্রায় ৪০০ কেজি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন তিনি। সব মিলিয়ে এ বছর প্রায় ২০ মণ আঙুর বাজারজাত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কামরুজ্জামান প্রধানিয়া আরও বলেন, আঙুর চাষে রোগবালাই ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে অতিবৃষ্টি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে নিয়মিত পরিচর্যা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরি।
চাঁদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু তাহের বলেন, কামরুজ্জামানের মতো সফলভাবে আঙুর চাষ করা সবাই সহজে পারে না। অনেকেরই আঙুর চাষে আগ্রহ থাকে, কিন্তু নানা কারণে সেই আগ্রহ শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা যায় না।
আবু তাহের আরও বলেন, যারা আঙুর চাষ করতে আগ্রহী, তাদের আগে অবশ্যই আঙুরের জাত, মাটি এবং ফলনের নিয়ম সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে। সঠিক জ্ঞান ও প্রস্তুতি ছাড়া এই চাষে সফল হওয়া কঠিন। নতুন করে কেউ আঙুর চাষে আগ্রহী হলে তারা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। আমরা অবশ্যই প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করব।

শরীফুল ইসলাম, চাঁদপুর