আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলার যুক্তিতর্ক শেষ, রায় যেকোনো দিন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আশুলিয়ায় ছয় লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন বিচারিক প্যানেল। ফলে যেকোনো দিন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণা করবেন ট্রাইব্যুনাল।
আজ মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে রায়ের জন্য দিন ধার্য করা হয়। ট্রইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, তারেক আব্দুল্লাহ, সাইমুম রেজা তালুকদার ও আবদুস সাত্তার পালোয়ান। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে ছিলেন মো. আমির হোসেন, এক আসামির ব্যক্তিগত আইনজীবী মিরাজুল আলম।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নির্বিচার গুলি চালালে বেশ কয়েকজন নিহত হন। আহত হন অনেকে। রাতে আশুলিয়া থানার অদূরে নবীনগর থেকে চন্দ্রাগামী মহাসড়কের এক পাশে ‘পুলিশ’ লেখা পিকআপ ভ্যানের আগুনে ভস্মীভূত অন্তত দুটি মরদেহ দেখেন পথচারীরা। এ ছাড়া থানার সামনে আগুনে পোড়া একটি মরদেহ ছিল। পদচারী–সেতুতে উল্টো করে ঝোলানো ছিল ক্ষত-বিক্ষত দুই পুলিশ সদস্যের লাশ। তখন স্থানীয় লোকজন আগুনে ভস্মীভূত একাধিক মরদেহ পিকআপভ্যানে থাকতে পারে বলে ধারণা করেছিলেন।
এ মামলায় ১৬ জন আসামি রয়েছেন। তন্মধ্যে আটজন গ্রেপ্তার রয়েছেন। আটজন পলাতক রয়েছেন। এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, আবজাল ও কনস্টেবল মুকুল। তবে সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) সাইফুলসহ আটজন এখনও পলাতক রয়েছেন।
গত ২ জুলাই এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় প্রসিকিউশন। আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে অন্যান্য তথ্যসূত্র হিসেবে ৩১৩ পৃষ্ঠা, সাক্ষী ৬২, দালিলিক প্রমাণাদি ১৬৮ পৃষ্ঠা ও দুটি পেনড্রাইভ যুক্ত করা হয়।
গত বছরের ৫ আগস্ট সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ছয়জন। এরপর পুলিশ ভ্যানে তাদের মৃতদেহ তুলে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নৃশংস এ ঘটনার সময় একজন জীবিত ছিলেন, কিন্তু তাকেও বাঁচতে দেননি তারা। পেট্রল ঢেলে জীবন্ত মানুষকেই পুড়িয়ে মারা হয়। এ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়।
যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন ও ঢাকা জেলা উত্তর ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেনের আইনজীবী মিরাজুল আলম নিজের আসামিদের নির্দোষ দাবি করেন।
ট্রাইব্যুনালকে মো. আমির হোসেন বলেন, আমার ক্লায়েন্টের দোষ প্রমাণ করতে পারেনি প্রসিকিউশন। কারণ, তিনি কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন না। অধীনস্তদের কোনো আদেশ বা নির্দেশ দেননি। তার কমান্ডিং অফিসার ছিলেন ডিবির ওসি রিয়াজ উদ্দিন। অতএব এ ঘটনায় কোনো জায়গায় আরাফাতের হস্তক্ষেপ করার কোনো এখতিয়ার ছিল না। এ সময় ট্রাইব্যুনালে নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া আরাফাত হোসেনের জবানবন্দি পড়ে শোনান মিরাজুল। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে আমার ক্লায়েন্ট (আরাফাত) ছিলেন না। অথচ তাকে আসামি করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল বলেন, গাড়ি (লাশ পোড়ানো) পোড়াতে অস্ত্র লাগে নাকি? অস্ত্র ছাড়াও তো গাড়ি পোড়ানো যায়। আপনার সাক্ষী সঠিক। উনাদের (প্রসিকিউশন) সাক্ষী সঠিক নয়।
জবাবে মিরাজুল বলেন, আমি (আরাফাত) তো ছিলাম না। ট্রাইব্যুনাল আরও বলেন, ভিডিওতে কি দেখা যায়নি? জবাবে আইনজীবী বলেন, না। দেখা যায়নি।
এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, যারা ভ্যানে লাশ তুলেছে, তারা কেউই দাঁড়িয়ে থাকেনি। লাশ ভ্যানে তুলে সবাই চলে গেছে।
এ সময় আরাফাতের আইনজীবী বলেন, এ মামলায় প্রসিকিউশন বলেছে ওয়াইড স্প্রেড অ্যান্ড সিস্টেম্যাটিক অ্যাটাক। কিন্তু ওই দিন আরাফাত ঊর্ধ্বতনের নির্দেশে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অর্থাৎ তাকে যখন, যেখানে অ্যাসাইন করা হয়েছে, তখন তিনি ওই কাজ করেছেন। পুলিশের ওপর হামলার আশঙ্কা ছিল বলেই তিনি তার ঊর্ধ্বতনের আদেশ মেনেছেন। কেননা ওই দিন বাংলাদেশের সব থানায় আক্রমণ করা হয়েছিল। দ্যাট ইজ সিস্টেম্যাটিক অ্যাটাক।
আসামিপক্ষের আইনজীবীর এমন কথায় আপত্তি জানান প্রসিকিউশন। মিরাজুলের উদ্দেশে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, আপনি কি জুলাই অভ্যুত্থানকে চ্যালেঞ্জ করছেন? একইসঙ্গে তার এ কথার ব্যাখ্যা চান প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। তখন কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি, বরং নিজে জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন বলে দাবি করেন। পরে তার কাছে ট্রাইব্যুনাল জানতে চান, আপনি (আরাফাত) ৫ আগস্ট ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না? জবাবে না বলেন মিরাজুল। তিনি বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে আরাফাতের সম্পৃক্ততা নেই। অতএব আমি তার খালাস আবেদন করছি।

নিজস্ব প্রতিবেদক