হাবিবুর, সুদীপ ও আখতারুলের মৃত্যুদণ্ড, বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দিন রাজধানীর চানখারপুলে শহীদ আনাস, ইয়াকুবসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া গ্রেপ্তারকৃত শাহবাগ থানার সাবেক ওসি (অপারেশন) আরশাদ হোসেনকে চার বছর, কনস্টেবল সুজন মিয়া, ইমাজ হোসেন ইমন ও নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে দণ্ড দেওয়া হয়।
আজ সোমবার (২৬ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করবেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। মামলাটির রায় ঘোষণা বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
এ মামলার চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং প্রসিকিউটর হিসেবে ছিলেন মীজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামিম, ফারুক আহম্মেদ, তারেক আব্দুল্লাহ। অপরদিকে, আসামিপক্ষে ছিলেন সাদ্দাম হোসেন অভি, সিফাত মাহমুদ শুভ ও আবুল হাসান। পলাতক চার আসামির পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী কুতুবউদ্দিন আহমেদ।
এ বিষয়ে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা চায়নিজ রাইফেল ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়। যারা অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের গালাগাল করা হয়, হুমকি দেওয়া হয়। ছয়জনকে হত্যার পাশাপাশি অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে গুলি করে আহত করা হয়। প্রসিকিউশন মামলা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রত্যেকেরই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হবে।
এ মামলায় আটজন আসামি রয়েছেন। এরমধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া চার আসামি হলেন—শাহবাগ থানার সাবেক ওসি (অপারেশন) আরশাদ হোসেন, কনস্টেবল সুজন মিয়া, ইমাজ হোসেন ইমন ও নাসিরুল ইসলাম।
পলাতক আসামিরা হলেন—সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম ও রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল।
মামলাটিতে মোট ২৩ কার্যদিবসে ২৬ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে শহীদদের পরিবারের সদস্য, প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ কর্মকর্তারা রয়েছেন। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদও আদালতে সাক্ষ্য দেন।
গত ১৪ জুলাই চানখারপুলে মামলাটির পলাতক চার আসামিসহ আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখারপুল এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে গুলি চালায় পুলিশ। এতে বহু হতাহতের ঘটনার পাশাপাশি শাহরিয়ার খান আনাসসহ ছয়জন নিহত হয়। অপর নিহতরা হলেন—শেখ জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা দেওয়া হয়। নথিপত্র পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ২৫ মে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে তা দাখিল করেন। অভিযোগ আমলে নিয়ে সেদিন ট্রাইব্যুনাল হাবিবুর রহমানসহ পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চানখারপুল এলাকায় আসামিরা নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করে। তদন্ত প্রতিবেদনটি ৯০ পৃষ্ঠার। প্রতিবেদনে ৭৯ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। তবে ট্রাইব্যুনালে ২৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। এ ছাড়া ১৯টি ভিডিও, পত্রিকার ১১টি রিপোর্ট, দুটি অডিও, বই ও রিপোর্ট ১১টি এবং ছয়টি ডেথ সার্টিফিকেট সংযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি অডিও কল রয়েছে হাবিবুর রহমানের, যিনি পুলিশ কমান্ড সেন্টার থেকে ওয়ারল্যাসের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেন পুলিশ সদস্যদের। তার এই নির্দেশের পরই প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেন পুলিশ সদস্যরা।
২০২৫ সালের ১৪ জুলাই আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম, সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ মোট ২৬ জন এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক