আওয়ামী লীগ নেতাদের সাজায় নিম্ন আদালত ছিল সরগরম
দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হওয়ার পর ২০২৫ সাল পুরো সময় ঢাকার নিম্ন আদালত ছিল সরগরম। আওয়ামী লীগ নেতাদের সাজা, আদালতে নেতাকর্মীদের দৌঁড়ঝাঁপে ব্যস্ত সময় পার হয়। তবে প্লট জালিয়াতির অভিযোগে শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের সাজা ছিল আলোচনার ইস্যু। তবে আওয়ামী লীগের ছোট বড় নেতাদের কারাবরণের মধ্যে আলোচনার ইস্যু ছিল হত্যা, দুর্নীতি মামলাসহ ১১ মামলায় দিলীপ কুমার আগরওয়াল এর জামিন। এছাড়া ১৪ দলের নেতাদের আদালতে আনা-নেওয়ার মাঝে খালেদা জিয়াসহ বিএনপির অনেক নেতাদের খালাস পাওয়ার বিষয়টি ছিল আলোচনার ইস্যু।
খালেদা জিয়ার খালাস
নাইকো দুর্নীতি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক রবিউল আলম এই রায় ঘোষণা করেন। খালাস পাওয়া অপর আসামিরা হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব খন্দকার শহিদুল ইসলাম, ঢাকা ক্লাবের সাবেক সভাপতি সেলিম ভূঁইয়া, সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব সি এম ইউসুফ হোসেন, সাবেক মুখ্যসচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) সাবেক মহাব্যবস্থাপক মীর ময়নুল হক ও নাইকো রিসোর্সেস (বাংলাদেশ) লিমিটেডের সাবেক প্রেসিডেন্ট কাশেম শরীফ।
নথি থেকে জানা গেছে, ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর দুদকের তৎকালীন সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম বাদী হয়ে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় খালেদা জিয়াসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিত্যক্ত দেখিয়ে কানাডার কোম্পানি নাইকোর হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে আসামিরা রাষ্ট্রের প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ক্ষতি করেছেন।
প্লট জালিয়াতির মামলা শেখ হাসিনার কারাদণ্ড
প্লট দুর্নীতির ছয় মামলার মধ্যে শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, শেখ রেহানা ও টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে পৃথক চার মামলার রায় ঘোষণা দেওয়া হয়। শেখ হাসিনাকে তার প্লট জালিয়াতির মামলায় সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ মামলায় তার এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সজীব ওয়াজেদ জয়ের কারাদণ্ড
প্লট জালিয়াতির মামলায় সজীব ওয়াজেদ জয়ের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শেখ হাসিনাকে ৭ বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের কারাদণ্ড
প্লট জালিয়াতির মামলায় সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, শেখ হাসিনাকে সাত বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শেখ রেহানা ও টিউলিপের কারাদণ্ড
প্লট জালিয়াতির মামলায় শেখ রেহানার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। এছাড়া তার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিককে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন আদালত।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, শেখ হাসিনাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের রাজউক এলাকায় ফ্ল্যাট থাকার পরও হলফনামায় তথ্য গোপন করেছেন। তিনি ও তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা পূর্বাচল নতুন শহর আবাসন প্রকল্পে ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা রাজউকের আইন, বিধি ও নীতিমালা মানেননি এবং তার মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে ও বোন শেখ হাসিনার ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্লট বরাদ্দসহ রেজিস্ট্রি করে দখল নিয়েছেন।
বছরজুড়ে আলোচনায় দিলীপ আগরওয়ালের জামিন
বৈষম্যবিরোধী মামলায় ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়াল এর জামিনের বিষয়টি বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল। এ মামলায় অনেকটা গোপনীয়ভাবে জামিন পেয়ে কারামুক্ত হন তিনি। এই বিষয়টি আদালত অঙ্গনে জানাজানির পর দেশজুড়ে সমালোচনার জন্ম দেয়।
পুলিশ ও আদালত–সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, দিলীপ কুমার আগরওয়াল উচ্চ আদালত ও ঢাকার আদালত থেকে জামিন পান।
২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দিলীপ কুমার আগরওয়ালকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরদিন তাঁকে আদালতে তোলা হয়। এরপর একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একই দিন তাঁকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এরপর বিভিন্ন হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এসব মামলায় নিম্ন ও উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন করেন তাঁর আইনজীবীরা। সব মামলায় জামিন পাওয়ার পর ১ অক্টোবর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
দিলীপ কুমার আগারওয়াল গত বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ (আলমডাঙ্গা ও সদরের একাংশ) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য।
দিলীপ কুমারের মামলার অভিযোগে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গত ১৯ জুলাই দুপুর ২টার দিকে বাড্ডা থানাধীন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে গুলিতে নিহত হন হৃদয়। এ ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন শাহাদাত হোসেন খান নামে এক ব্যক্তি।
এদিকে চোরাচালানের মাধ্যমে সোনা ও হীরা সংগ্রহ করে অর্জিত ৬৭৮ কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দিলীপ কুমার আগরওয়াল এর বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছিল।
নথি থেকে জানা গেছে, দিলীপ কুমার আগরওয়াল ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড ও ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দেশে-বিদেশে সোনা ও হীরা ব্যবসা পরিচালনার আড়ালে অর্থ পাচার ও চোরাকারবারি করে আসছিলেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের বিষয়ে সিআইডি বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০০৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এলসির মাধ্যমে বিদেশ থেকে মোট ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার সোনার বার, অলঙ্কার, লুজ ডায়মন্ড ও অন্যান্য দ্রব্য বৈধভাবে আমদানি করে। একই সময়ে স্থানীয় বাজার থেকে ক্রয়, বিনিময় ও পরিবর্তন পদ্ধতিতে ৬৭৮ কোটি টাকার সোনা ও হীরা সংগ্রহ করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সিআইডিকে এসবের উৎস বা সরবরাহকারী সংক্রান্তে বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়। বৈধ নথি না থাকায় এসব বিপুল সোনা ও হীরা অবৈধ চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে আনা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়।
খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম
২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর ঢাকার উত্তরা-১২ নম্বর সেক্টর থেকে কামরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে চলতি বছরেও রিমান্ডে নেওয়া হয়। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া তিনি আদালতে এসে পুলিশ সদস্যদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ আনা হয়েছে।
শামসুল হক টুকু
জুলাই বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলায় সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুকে ঢাকার খিলক্ষেত থানার নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপরে তাঁকে জুলাই বৈষম্যবিরোধী বিভিন্ন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে ও কারাগারে পাঠানো হয়।
জুনাইদ আহমেদ পলক
জুলাই বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলায় সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তিনি বিভিন্ন সময়ে আদালতে গান গেয়ে বা বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে আলোচনায় ছিলেন।
সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক
জুলাই হত্যা মামলায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট ঢাকার সদরঘাট এলাকা থেকে আটক করা হয়। এরপরে তাকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গ্রেপ্তারের পরে তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। বছরজুড়ে তাঁকে আদালতে আনা হয় এবং বেশ আলোচনায় ছিলেন তিনি।
সালমান এফ রহমান
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট। এরপরে তাকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। চলতি বছরে একাধিক সময়ে একাধিক মামলায় তাকে আদালতে আনা হয়েছে।
জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু
বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপরে তাকে একাধিক মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হয়। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। বছরজুড়েই বিভিন্ন মামলায় তাঁকে আদালতে আনা হয়েছে।
সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি
বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলায় সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী দীপু মনিকে ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপরে তাকে বৈষম্যবিরোধী একাধিক হত্যা মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হয়। তিনি বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন।
রাশেদ খান মেনন
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননকে বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলায় গত ২২ আগস্ট গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বৈষম্যবিরোধী একাধিক মামলায় রাশেদ খান মেননকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাকে আদালতে প্রায় সময় নিয়ে আসা হতো। বছরজুড়েই তিনি আলোচনায় ছিলেন।

শুভ্র সিনহা রায়