সরিষার হলুদে নতুন রূপে নেত্রকোনার মাঠ
বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে বাতাসে দোল খাওয়া সরিষা ফুল যেন প্রকৃতিতে যোগ করেছে অনন্য এক সৌন্দর্য। হেমন্তের শেষে আর পৌষের শুরুতে যখন শীতের সকাল নেমে আসে, তখন বাংলার প্রকৃতি এক অপার্থিব রূপ ধারণ করে। রোপা আমন পরবর্তী বোরো ধান চাষের আগের এই অন্তর্বর্তী সময়ে নেত্রকোনা জেলার দিগন্তজোড়া ফসলি জমি এখন হলুদের গালিচায় ঢাকা। জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় চরিত্র হিমুর হলদে পাঞ্জাবির মতোই যেন মাঠের পর মাঠ সেজেছে নতুন রূপে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় আবাদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ বছর জেলায় মোট ১৪ হাজার ৩২ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ করা হয়েছে, যা গত বছরের ১৩ হাজার ৫০ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। মূলত আমন ও বোরো ধানের মধ্যবর্তী সময়ে জমি পতিত না রেখে ‘বোনাস ফসল’ হিসেবে সরিষা চাষে ঝুঁকছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
সদর উপজেলার পশ্চিম উলুয়াটি গ্রামের কৃষক আব্দুল মন্নাফ খান জানান, আগে আমন কাটার পর জমি অলস পড়ে থাকত। এখন কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে আগাম জাতের আমন চাষ করায় সময়মতো সরিষা বোনা সম্ভব হচ্ছে। তিনি বলেন, কার্তিক মাসের মাঝামাঝি বীজ ছিটিয়েছি, ফসল ঘরে তুলতে মাত্র তিন মাস সময় লাগে। গত বছর ৪ কাঠা জমিতে ৫ মণ সরিষা পেয়েছিলাম, সেই সফলতায় এবার আবাদ আরও বাড়িয়েছি।
চল্লিশা ইউনিয়নের লাইট গ্রামের কৃষক রফিক মিয়া জানান, নদীর চরের জমিতে তারা বংশপরম্পরায় সরিষা চাষ করছেন। তবে বর্তমানে উন্নত জাতের বীজের কারণে ফলন ও চাহিদা দুটিই বেড়েছে।
সরিষা চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ ও সারের খরচ থাকলেও বর্তমান বাজারে এর বিপুল চাহিদা কৃষকদের লাভের মুখ দেখাচ্ছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ সরিষা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক কৃষক আবার নিজেদের পরিবারের স্বাস্থ্যকর তেলের চাহিদা মেটাতেও সরিষা আবাদ করছেন। বাণিজ্যিক লাভের পাশাপাশি বিশুদ্ধ ভোজ্যতেলের সংস্থান হওয়ায় খুশি সাধারণ চাষিরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মুকশেদুল হক জানান, আমন এবং বোরো ধানের মধ্যবর্তী এই আড়াই মাস সময় কৃষির জন্য এক বিশাল সম্ভাবনা। তিনি বলেন, আমরা সরকারি প্রণোদনার আওতায় জেলায় ১১ হাজার কৃষককে বীজ ও সার দিয়েছি। এছাড়া আরও ৩ হাজার ৫০০ কৃষককে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সহায়তা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, উঠান বৈঠক ও মাঠ দিবসের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে বারী সরিষা-১৪, ১৭ এবং বিনা-৯ ও ১১-এর মতো আধুনিক জাতগুলো জনপ্রিয় করা হচ্ছে। বিশেষ করে নেত্রকোনা সদর, মদন ও পূর্বধলা উপজেলায় সরিষার এই ফলন এখন দৃশ্যমান বিপ্লবে রূপ নিয়েছে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)