দুই মাস ধরে পানিবন্দি যশোরের ১০ লাখ মানুষ
যশোরের ভবদহ অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি। গত আগস্টে দুই দফা অবিরাম বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পানি এবং হরিহর, শ্রীহরি, মুক্তেশ্বরী, টেকা ও ভদ্রা নদীর উপচে পড়া পানিতে বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে।
ফলে কেবশপুর, মনিরামপুর, অভয়নগর, ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলার চারশ গ্রামের প্রায় ১০ লাখ মানুষ দুই মাস ধরে পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বন্যার পানি বাড়িঘরে উঠে যাওয়ায় এই পাঁচ উপজেলার মানুষকে বিভিন্ন সড়ক, উঁচু স্থান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিতে হয়েছে। যাঁরা এখনো গ্রামাঞ্চলে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন, তাঁরা গৃহপালিত পশু-পাখি, সাপ, পোকামাকড়ের সঙ্গে বসবাস করছেন। সাপের কামড়ে ও পানিতে ডুবে এখন পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। পানিবন্দি এলাকায় মানুষের খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ ও পানিবাহিত রোগে।
বন্যার শুরুতে বানভাসি মানুষের জন্য সরকারিভাবে পাঁচ উপজেলায় ৩৪০ টন চাল ত্রাণ হিসেবে ও সাত লাখ ৬৫ হাজার টাকা দেওয়া হলেও এখন আর কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন দুর্গত মানুষ।

বন্যার পানিতে ডুবে পাঁচ উপজেলায় ৩৩ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমির ১৮৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকার আউশ, আমন ধান, সবজি, মরিচ ও পানের ক্ষতি হয়েছে। ২৮ হাজার ২২৭টি মাছের ঘের ও বিভিন্ন পুকুরের ৩৪৭ কোটি ৬৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকার সাদা, চিংড়ি ও পোনা মাছ পানির তোড়ে ভেসে গেছে। পানির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে শত শত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ।
বন্যার পানিতে দুই হাজার ৩১৯টি গভীর ও অগভীর নলকূপ এবং ৩৬ হাজার ২৩২টি শৌচাগার ডুবে গেছে। বন্যার পানিতে ৫৪ হাজার ৫৭৭টি বাড়িঘর সম্পূর্ণ ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে গরু ও হাঁস-মুরগির খামারের। মসজিদ, মন্দির ও গির্জায় পানি উঠে যাওয়ায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে রয়েছে। পানিতে ডুবে শত শত কিলোমিটার কাঁচা-পাকা রাস্তা নষ্ট হয়েছে। এখনো গ্রামের অধিকাংশ রাস্তা পানিতে তলিয়ে রয়েছে।
এদিকে স্লুইসগেটের মুখের পলি অপসারণ করে দ্রুত বন্যার পানি নিষ্কাশন ও বিল কপালিয়ায় টিআরএম প্রকল্প চালু করার দাবিতে প্রতিদিন হাজার হাজার বানভাসি মানুষ পাঁচটি উপজেলা, জেলা শহর, এমনকি রাজধানীতেও মিছিল-মিটিং, ঘেরাও এবং মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে চলেছেন।

গত ২৪ ও ২৯ আগস্ট হরিহর নদীতে দুটি ও শ্রীহরি নদীতে একটি ড্রেজার দিয়ে পলি অপসারণের কাজ শুরু করলেও পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিত বাওয়ালী বলেন, হরিহর, শ্রীহরি, ভদ্রা, টেকা, মুক্তেশ্বরী নদীতে এবং ভবদহের ২১ ও ৯ ভেন্টের স্লুইসগেটের মুখে পলি পড়ে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেবশপুর, মনিরামপুর, অভয়নগর, ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলার ৪০০ গ্রামের প্রায় ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ষড়যন্ত্রকারী ব্যক্তির কারণে বিল কপালিয়ায় টিআরএম চালু হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। এইসব পানিবন্দি মানুষ এখন নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে চান বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে যশোরের মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান বলেন, এলাকার নদীগুলোতে পলি পড়ে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় উপদ্রুত এলাকাগুলো থেকে পানি সরতে পারছে না। দ্রুত বন্যার পানি নিষ্কাশনের জন্য হরিহর নদীতে দুটি এবং শ্রীহরি নদীতে একটি ড্রেজার দিয়ে পলি অপসারণের কাজ শুরু করা হয়েছে। এ ছাড়া ভবদহে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মিটিং করে টিআরএম চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। বানভাসি মানুষের দুর্দশা লাঘবে সব ধরনের প্রচেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

আশরাফ-উজ-জামান খান, কেশবপুর