রেলমন্ত্রীর সাথে ‘খুনিরা’, ছাত্রলীগের পোস্টারিং
শংকর দাস হত্যা মামলার প্রধান আসামি ইমরান খান, আরমান খান গংদের হাতে নির্মমভাবে নিহত এম সাইফুল ইসলামের খুনিদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসি চাই।
এটি একটি পোস্টারের ভাষা। রক্ত আর লাল রঙের আধিক্যের এই পোস্টার আজ শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে দেয়ালে দেয়ালে দেখা যাচ্ছে। পোস্টারটিতে লাল রঙে ক্রস ও গোলচিহ্নিত করে কয়েকজন ব্যক্তিকে সম্প্রতি নিহত হওয়া কুমিল্লা শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলামের খুনি হিসেবে দাবি করেছে মহানগর ছাত্রলীগ। দুটি অনুষ্ঠানের ছবিতে সেই ‘খুনি’দের দেখা যাচ্ছে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের সঙ্গে।
এম সাইফুল ইসলাম প্রধান গত ১২ এপ্রিল কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ে পূবালী চত্বরে ছাত্রলীগেরই একটি পক্ষের হামলায় নিহত হন। ওই সময় সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা কয়েকজনের ছবি পোস্টারে প্রকাশ করেছে ছাত্রলীগ। পোস্টারে তাদের খুনি উল্লেখ করে ‘গ্রেপ্তার ও ফাঁসি’ চাওয়া হয়েছে।
ওই পোস্টারে ১৩ জনের আলাদা আলাদা ছবি দেওয়া আছে। পোস্টারে দাবি করা হয়েছে, এরা সাইফুলকে হত্যা করেছে। আরেকটি ছবিতে দেখা গেছে, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন সাইফুল হত্যা মামলার প্রধান আসামি ইমরান খান। অন্য একটি ছবিতে দেখা গেছে. একজনকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে অস্ত্রধারীরা। ছবির ক্যাপশনে লেখা আছে, ‘অস্ত্র ঠেকিয়ে সাইফুলকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে সুমন দাস ও সাব্বির’। পোস্টারে আরো দুটি ছবি আছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে সিঁড়িতে পড়ে আছে সাইফুলের রক্তমাখা মৃতদেহ।
কুমিল্লা (দক্ষিণ) জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দিন আহমেদ এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘গত ১১ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের একটি কর্মী সমাবেশ ছিল। কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের ছাত্রলীগ পদপ্রার্থীদের সাক্ষাৎকারের অংশ হিসেবে এ সমাবেশ করা হয়। তিনি বলেন, ১ বা ২ এপ্রিল এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি তিনি পান। পরে বিষয়টি কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য হাজি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারকে দেখান। সে সময় বাহার তাঁকে ভালোভাবে কর্মসূচি আয়োজন করতে বলেন।
জালাল উদ্দিন বলেন, গত ১২ এপ্রিল সম্মেলনের দিন ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমসহ ১০-১৫ জন নেতা-কর্মী কুমিল্লা টাউন হল মিলনায়তনে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে রেলমন্ত্রীর সমর্থক ছাত্রলীগের একাংশ কর্মসূচি বানচালের চেষ্টা করে। কিন্তু সাইফুলের চেষ্টায় কর্মসূচি সফলভাবে শেষ হয়। বিকেল ৪টার দিকে রেলমন্ত্রীর সমর্থক ছাত্রলীগের ওই অংশটি শহরের পূবালী চত্বরে ফাঁকা বোমা ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করে।
দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, বিকেল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে কান্দিরপাড়ে পূবালী চত্বরে চা খেতে গেলে সুমন, সাব্বির ও জসিমসহ ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী সাইফুলকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর ছোরা দিয়ে ১১টি আঘাত করে তাঁকে গুরুতর জখম করা হয়। পরে কুমিল্লা মুন হাসপাতালে নেওয়ার পর ১২ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাইফুল ইসলাম।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রলীগের একাধিক নেতা দাবি করেন, সাইফুলের হত্যাকারীরা রেলমন্ত্রীর চেম্বারে বসেছিল। সেখানে বসেই হত্যার পরিকল্পনা হয়। হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি ইমরান খানসহ কয়েকজন রেলমন্ত্রীর চেম্বারেই ছিল।
নেতারা অভিযোগ করেন, সাইফুল হত্যার পর রেলমন্ত্রী একটি শোকবার্তাও দেননি। জানাজায় অংশ নেননি। অথচ তিনি জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক।
জেলা ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানায়, জেলা আওয়ামী লীগের বিভক্ত নেতৃত্বের কারণে নিহত হয়েছেন সাইফুল। কুমিল্লা জেলা (দক্ষিণ) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আফজল খান এবং রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের প্রতিপক্ষ সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার। রাজনীতিতে বাহার ও আফজল খানের দ্বৈরথের বয়স দুই দশকেরও বেশি।
২০১১ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাইফুল ইসলাম আফজাল খানের ছোট ভাই হিম্মৎ খানের বিপক্ষে কাউন্সিলর নির্বাচন করেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সাইফুল আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বাহাউদ্দিন বাহারের পক্ষে কাজ করেন। মূলত এসব ঘটনার পর থেকে আওয়ামী লীগের একটা অংশের রোষানলে পড়েন সাইফুল।
কুমিল্লা জেলা উত্তরের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ আহমেদ ফকির বলেন, ‘এটা আসলে দক্ষিণের ঘটনা। এ বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবেন। এটা অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে হয়ে থাকতে পারে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার সাইফুল হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে কুমিল্লা শহরে মানববন্ধন হয়। সেখানে অংশগ্রহণকারী একাধিক নেতা সাইফুল হত্যায় রেলমন্ত্রীর সম্পৃক্ততার কথা দাবি করেন।
এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। এ ধরনের অভিযোগ যদি কেউ করেন, তবে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’
রেলমন্ত্রী বলেন, ‘ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকতে পারে।’
মামলা হলেও গ্রেপ্তার নেই
সাইফুল হত্যার ঘটনায় কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম রিন্টু কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ জানায়, ২২ জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে কুমিল্লা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ইমরান খানকে। ইমরানের বাবা কুমিল্লা জেলা (দক্ষিণ) আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আফজল খান। ইমরান গত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৬ আসনে বর্তমান আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খোরশেদ আলম বলেন, ‘সাইফুল হত্যা মামলা নিয়ে পুলিশ কাজ করছে। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। পুলিশ দায়ী ব্যক্তিদের আটক করার চেষ্টা করছে।’

নিজস্ব প্রতিবেদক