সময় চলে যায়, ঝুলে রয় মামলা
কুমিল্লার দেবীদ্বারের বাসিন্দা আজম হোসেন। উত্তরার অ্যাপারালস নামে একটি গার্মেন্ট কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন তিনি। তুচ্ছ ঘটনায় ২০১০ সালের আগস্টে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
পরের বছরই তিনি পাওনা আদায় ও চাকরি ফিরে পাওয়ার জন্য ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে দুই লাখ ২১ হাজার টাকার একটি মামলা করেন, যার নম্বর বিএলএ মজুরি মামলা নং-২০৫৯/১১। তবে এর পর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর মামলার নিষ্পত্তি হয়নি।
আজম হোসেন এনটিভি অনলাইনকে বলেন, 'পাঁচ বছর আদালতে ঘুরতে ঘুরতে হয়রান হয়ে গেছি। যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি, তাঁরা বড় বড় কারখানার মালিক। তাঁরা কৌশলে তাঁদের অফিসের আইনজীবীর মাধ্যমে সময়ের আবেদন করে মামলা ঝুলিয়ে রাখছেন।'
আজম এখন অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। প্রতিবার মামলার নির্ধারিত তারিখে ন্যায়বিচারের আশায় অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তাঁকে আদালতে আসতে হয়। আজম বলেন, ‘বিচারক মামলার রায় দিতে চাইলে প্রতিপক্ষের আইনজীবী নানা কৌশলে আদালত থেকে সময় চেয়ে নেন। ফলে মামলায় রায়ের দিন ক্রমে পেছানো হচ্ছে। আইনি জটিলতার কারণে বিচারক রায় দিতে পারছেন না। অন্যদিকে, আদালতের বিচারক প্রায়ই বসেন না। বর্তমানে এ আদালতে কোনো বিচারক নেই। গত ১৭ সেপ্টেম্বর এ মামলার রায়ের দিন থাকলেও বিচারক অবসরে চলে যাওয়ায় রায় দেওয়া হয়নি। নতুন বিচারক কবে আবার নতুন করে আসবেন, তা-ও অনিশ্চিত।’
আজমের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শুভ্র সিনহা রায় এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘প্রতিপক্ষ ইচ্ছা করে এ মামলা দীর্ঘায়িত করছেন। এভাবে সময় নিতে থাকলে বাদী/পাওনাদার ভবিষ্যতে আদালতে মামলা চালাতে চাইবেন না। আদালত যদি মামলাগুলো নিষ্পত্তি করে দেন, তাহলে বাদীরা তাঁদের পাওনা ফিরে পাবেন। অন্যথায় বাদী ও বিবাদীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন।’
অন্যদিকে, একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই আদালতে ২০১১ সালে ইব্রাহিম নামের আরেক ব্যাক্তি দুই লাখ ২০ হাজার টাকার একটি মামলা করেন। মামলা নম্বর বিএলএ মজুরি নং-২০৬১/১১। সে মামলাটিতেও পাঁচ বছর ধরে রায় দেওয়া হয়নি।
শুধু আজম বা ইব্রাহিমের মতো ব্যক্তিরা নন, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী এভাবে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালসহ সারা দেশে আরো সাতটি শ্রম আদালতে ১৪ হাজার ৫২৩টি মামলা বিচারাধীন। মামলাগুলোতে বিচারপ্রার্থী লক্ষাধিক। শুধু ঢাকার তিনটি শ্রম আদালতেই রয়েছে ১১ হাজার ৪৮৯টি মামলা।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের দুই শ্রম আদালতে এক হাজার ৩৮২, বিভাগীয় শ্রম আদালত খুলনায় ৭৫৫ এবং বিভাগীয় শ্রম আদালত রাজশাহীতে ৩১৫টি মামলা বিচারাধীন।
শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে রয়েছে ৫৮২টি মামলা। বেশির ভাগ মামলাই দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।
এ ধরনের মামলার নিষ্পত্তির হার একেবারেই কম। ফলে এসব আদালতে মামলা করেও অধিকার আদায় করতে পারছেন না শ্রমিকরা। দিনের পর দিন তাঁদের ঘুরতে হচ্ছে আদালতের বারান্দায়। আর এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কোনো ব্যবস্থাও নিচ্ছে না সরকার।
ঢাকার শ্রম আদালতের আইনজীবী বেলাল হোসেন জসিম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই আদালতগুলোতে শ্রমিকরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কারণ, বিবাদী প্রভাবশালী কারখানার মালিক ও ব্যবসায়ীরা নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে মামলার বিচারকাজ ঝুলিয়ে রাখেন।’
এই আইনজীবী আরো বলেন, 'এই আদালতগুলোর প্রতি সরকারের তেমন কোনো নজর নেই। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার পেতে হলে সরকারের এ আদালতের দিকে সুনজর দিতে হবে। তা না হলে শ্রম আদালত গঠনের সুফল ভোগ করতে পারবেন না ভুক্তভোগীরা।’

নিজস্ব সংবাদদাতা