মালদ্বীপে বাংলাদেশি কর্মী ‘খুন’, জানে না মন্ত্রণালয়
মালদ্বীপের লামু আটল গান দ্বীপে গত বৃহস্পতিবার এক বাংলাদেশি শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই শ্রমিকের নাম বাদশাহ। তাঁর বাড়ি জামালপুরে।
ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো এ বিষয়ে কিছু জানে না বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মালদ্বীপে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও তাদের কিছু জানানো হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
বাদশাহর পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ১১ জুন তাঁর বন্ধুদের মারফত পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, বাদশাহ মারা গেছেন।
বাদশাহর ছেলে আলামিন হোসেন আরিফ অভিযোগ করেন, ‘নিয়োগকর্তাই বাবাকে হত্যা করেছেন। মৃতদেহটি কী করা হয়েছে সে বিষয়েও আমরা অন্ধকারে রয়েছি।’
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার বিভাগের পরিচালক জামাল হোসেন এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি এখনো জানি না।’
কীভাবে মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানাতে হবে তা জানতে চাইলে জামাল হোসেন বলেন, ‘মালদ্বীপের হাইকমিশন আমাদের ইনফর্ম করবে। অথবা ভিকটিমের ফ্যামিলি জানাবে। তারা লিখিতভাবে জানাতে পারে আবার মৌখিকভাবেও জানাতে পারে। পাসপোর্টের কপি ইত্যাদি প্রমাণসহ আমাদের জানাতে পারে। এরপর আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
পরে আজ বিকেলে বাদশাহর পরিবারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, মালদ্বীপ দূতাবাসের সঙ্গে কথা বলে তারপর পদক্ষেপ নেবে তারা।
১০ বছর আগে ওয়ার্কার ভিসা নিয়ে মালদ্বীপ যান আবুল বাশার ওরফে বাদশাহ মিয়া। কিমস ইনভেস্টমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেডের কর্মী হিসেবে সেখানে যান তিনি।
এরপর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে দেশে ফিরে আসতেও চেয়েছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাদশাহ মিয়া। গত বছর তাঁর ছেলে জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন ছেলের এসএসসির পরই দেশে ফিরবেন।
বাদশাহর পরিবার অভিযোগ করে বলেছে, স্থানীয় যে বাংলাদেশিরা বাদশাহকে চিনত, তারা যখন বাদশাহর মৃতদেহ দেশে পাঠানোর দাবি তোলেন, তখন তাঁদের আটকের হুমকি দেয় সেখানকার পুলিশ।
নিহত বাদশাহ নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তান আলামিন হোসেন আরিফ এনটিভি অনলাইনকে বলে, ‘বাবার মৃত্যুর খবর শুনেছি দুই দিন হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো আমরা জানি না তাঁর মৃতদেহের দাফন করা হয়েছে কি না।’
গত ১১ জুন যে বাড়িটিতে বাদশাহর মৃতদেহ পাওয়া গেছে সে বাড়ির মালিক ও তত্ত্বাবধায়ক মিলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার বাবাকে হত্যা করেছে বলে এনটিভি অনলাইনের কাছে সন্দেহ প্রকাশ করে আরিফ।
নিহতের পরিবার মালদ্বীপের বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। এমনকি বাদশাহর নিয়োগকর্তার সঙ্গেও টেলিফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানায় আরিফ।
আরিফ আরো জানায়, তার বাবার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁকে কাজে নিয়োগ দেন বাড়ির মালিক ও নিয়োগকর্তা তোহা ওয়াহিদ।
তোহার কাজে গত ১ জুন যোগ দেন বাদশাহ। এরপর ১১ জুন তাঁর বন্ধুদের মারফত পরিবারের সদস্যরা জানতে পারে বাদশাহ মারা গেছেন। এটিকে মৃত্যু না বলে হত্যাকাণ্ডই বলতে চায় আরিফ।
মালদ্বীপে বাদশাহর সঙ্গে কারো কোনো বিরোধ ছিল না বলেও নিশ্চিত করে আরিফ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের অংশ হিসেবে বাদশাহ সবশেষ গত ৯ জুন রাত ১১টার দিকে ছেলে আরিফের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন।
ওই বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক ইশাগ ইউসুফের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, বাড়ির মালিক বাদশাহকে ওই বাড়িটিতে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন।
ওই বাড়িটিতে কোনো টয়লেট ছিল না এবং বাদশাহকে বারান্দায় ঘুমাতে হতো। এটা দ্বারাই বোঝা যায় যে মালদ্বীপে নিয়োগকর্তারা শ্রমিকদের ওপর কেমন আচরণ করে। তবে বাড়ির মালিক তোহা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদশাহ মরদেহ বারান্দায় পড়ে ছিল। তাঁর মুখের ওপর একটি রক্তমাখা বালিশ চাপা দেওয়া ছিল। তাঁর মুখের ডানদিকের অংশটা থেঁতলানো ছিল।
মৃতদেহ উদ্ধারের অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে জানিয়েছে মালদ্বীপের পুলিশ। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
এই বছর বাদশাহসহ তিন বাংলাদেশি শ্রমিককে হত্যা করা হলো। এর আগে গত ২২ মার্চ শাহীন মিয়া নামের এক বাংলাদেশিকে মালে ক্যাফেতে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
মালদ্বীপে বাংলাদেশের প্রায় এক লাখ ২৪ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। অভিবাসন অধিদপ্তর বলছে এদের মধ্যে ৩০ হাজারের কাছে কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই।

অনলাইন ডেস্ক