শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ‘শরতের অসন্তোষ’ ছড়িয়ে পড়ছে ইতালিতে
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় ইতালি এক উত্তাল শরৎ কালের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী বছরের নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটির শিক্ষার্থী, ট্রাকচালক ও কৃষকেরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
ইতালি জুড়ে বিভিন্ন ধরনের বিক্ষোভের উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির কট্টর ডানপন্থি সরকারের বিরোধিতায় একত্রিত হয়েছে। এসব বিক্ষোভের কয়েকটি ফ্রান্স ও স্পেনের সাম্প্রতিক আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে একটি শিক্ষক ইউনিয়ন, যারা বেতন বৃদ্ধি ও নতুন শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়েছে।
রোমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে হাজার হাজার মানুষ সমাবেশ করে। পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা তাদের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে বোতল ও জ্বলন্ত ফ্লেয়ার নিক্ষেপ করেছেন। বেশ কয়েকটি শহরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল করে বিক্ষোভও চলছে।
প্রধান শ্রমিক সংগঠন সিজিআইএলের নেতা ক্রিশ্চিয়ান ফেরারি এএফপিকে বলেন, ‘ইতালি একটি গুরুতর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’
ক্রিশ্চিয়ান ফেরারি আরও বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠেছে, আমাদের উৎপাদনব্যবস্থা প্রতিদিনই দুর্বল হচ্ছে, পরিবেশগত জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে... কিছু মানুষ বলছেন, আর নয়।’
ক্রিশ্চিয়ান ফেরারি জানান, বিক্ষোভের উদ্দেশ্য হলো, নির্বাচনি প্রচারণা কেন্দ্র করে ইতালীয়দের জীবনযাপন ও কর্মপরিবেশের বাস্তব পরিস্থিতিকে ধরে রাখা।
মজুরি হ্রাস
ইতালির সংবাদমাধ্যমগুলো এই সময়কে প্রধানমন্ত্রী মেলোনির জন্য ‘অসন্তোষের শরৎ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। মেলোনি প্রায়ই ইতালির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা তুলে ধরেন।
গত মাসে তার সরকার ইতালির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা সরকারে পরিণত হয়েছে। দেশের সরকারি অর্থব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যও তার সরকার প্রশংসা পেয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ব্যাপকভাবে।
কোভিড-১৯ মহামারির পর এবং পরবর্তী ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ইউরোপের সব দেশেই মূল্যস্ফীতির ঢেউ আঘাত হেনেছে। তবে ইতালিতে এর প্রভাব বিশেষভাবে তীব্র হয়েছে। কারণ, কয়েক দশক ধরে দেশটির মজুরি ও উৎপাদনশীলতা প্রায় স্থবির হয়ে রয়েছে।
পার্লামেন্টারি বাজেট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করা প্রকৃত মজুরি ১৯৯০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ৬.৬ শতাংশ কমেছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) তথ্য অনুযায়ী, মহামারির পর ইতালির প্রকৃত মজুরি ইউরোপের অন্যান্য প্রধান অর্থনীতির তুলনায় আগের অবস্থায় ফিরতে বেশি সময় নিয়েছে।
কয়েক মাস পরিস্থিতি শান্ত থাকার পর সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়ে বার্ষিক হিসাবে ৪.২ শতাংশে পৌঁছায়। ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইস্তাতের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এর অন্যতম প্রধান কারণ।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে চলতি সপ্তাহের শুরুতে পুগলিয়া, কালাব্রিয়া ও সিসিলি অঞ্চলে কৃষক ও ট্রাকচালকেরা সড়ক অবরোধ করেন। এর ফলে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হয় এবং পাস্তা উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ে।
পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন কনফট্রাসপোর্তো এখন দেশব্যাপী অবরোধের হুমকি দিয়েছে। সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত অসহনীয় পরিস্থিতি এমন এক উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছে, যা আর সহ্য করা যাচ্ছে না।
জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মেলোনি জ্বালানির লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। প্রথমে ব্যয়বহুল কর স্থগিতের মাধ্যমে এবং পরে বড় জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। আপাতত এসব প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় প্রতি লিটার পেট্রলের দাম দুই ইউরোর নিচে রাখা হচ্ছে।
নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি ক্রমেই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠছে।
রোমের লুইস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ভেরোনিকা দে রোমানিস বলেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক কারণগুলোর সম্মিলিত প্রভাব কিছু ইতালীয়কে বিক্ষোভে অংশ নিতে উৎসাহিত করছে।
তরুণদের মধ্যে হতাশা বিশেষভাবে বেশি। কারণ, ইতালিতে বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কর্মজীবনে উন্নতি যোগ্যতার ভিত্তিতে হয় না, বরং চাকরির জ্যেষ্ঠতার ওপর নির্ভর করে। এ কারণে অনেক তরুণ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
রোম, মিলান ও বোলোনিয়া শহরের কেন্দ্রস্থলেও শিক্ষার্থীরা জীবনযাত্রা ও পড়াশোনার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নিয়েছেন।
বুধবার মিলানের পোর্তা নুওভা ব্যবসায়িক এলাকায় ইউনিক্রেডিট ব্যাংকের টাওয়ার ও লোম্বার্দিয়া অঞ্চলের সদর দপ্তরের মাঝখানের ঘাসে প্রায় ১০ জন শিক্ষার্থী তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান শুরু করেন।
বিক্ষোভকারীদের একজন, ২২ বছর বয়সী রিকার্দো এএফপিকে বলেন, ইতালির প্রয়োজন একটি নতুন, বৃহৎ শরৎকালীন আন্দোলন। তিনি আরও বলেন, ‘ফ্রান্সের মতো দেশকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ফেলতে কিংবা স্পেনের মতো প্রতিটি সড়ক অবরোধ করতে আমরা সফল না-ও হতে পারি। কিন্তু এসব কর্মকাণ্ডের অন্তত একটি উদ্দেশ্য হলো—মানুষ যেন আবারও এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করে।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক