ভারতে জেন-জি’র তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে মোদির সেই ‘ভাইরাল’ রিল
বিতর্ক বা সংকটকালে নীরব থাকার জন্য প্রায়শই সমালোচিত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘নিট’ আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুটি ভিডিও প্রকাশ করেন। দেশটির সরকারি সংবাদ মাধ্যম ডিডি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে একটি ভিডিও ৩০ কোটি ৩০ লাখ (৩০৩ মিলিয়ন) ভিউ পেয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেখা 'রিল'-এ পরিণত হয়েছে এবং নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। খবর দ্য টেলিগ্রাফের।
ভারতে গত ৩৬ দিন ধরে চলতে থাকা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে এই আন্দোলন শনিবার (২৫ জুলাই) চূড়ান্ত পরিণতি পায়। শিক্ষার্থীরা তাদের মূল দাবি আদায় করে নেয়— ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন।
এই রাজনৈতিক সাফল্য সত্ত্বেও, আন্দোলনকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটাক্ষ ও ব্যঙ্গ ছুড়ে দিতে থাকে। তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল নিয়ে মজা করে, ভিডিওর সঠিক সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং তার বক্তব্য শুরুর সম্ভাষণ 'ফ্রেন্ডস'কে প্রত্যাখান করে।
অনেকে কড়া জবাব দিয়ে লেখেন, 'আমরা বন্ধু নই', আবার অনেকে কৌতুক করে বলেন যে, 'মিত্র' শব্দটির পরিবর্তে 'ফ্রেন্ডস' ব্যবহার করাটা ছিল কেবল একটি প্রচারণামূলক কৌশল, যা পুরোপুরি ফ্লপ হয়েছে।
নরেন্দ্র মোদির প্রকাশ্য বার্তা বা বক্তব্যে নজিরবিহীন ফ্রন্ট-ক্যামেরা অ্যাঙ্গেলটি প্রথম দফায় ব্যাপক ট্রোল ও উপহাসের জন্ম দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা বিষয়টিকে 'এড়িয়ে চলা দৃষ্টিভঙ্গির ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল' বলে আখ্যা দেয়। শিক্ষার্থীদের আকুল আবেদনে সরকারের দীর্ঘ নীরবতার সাথে প্রধানমন্ত্রীর আচমকা গভীর রাতের এই ভিডিওর তুলনা করে একাধিক ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে 'টক্সিক বয়ফ্রেন্ড' (বিষাক্ত প্রেমিক)-এর সাথে তুলনা করে।
ভাইরাল হওয়া একটি ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল: 'আমাদের এড়িয়ে চলা বিষাক্ত প্রেমিকের কাছ থেকে গভীর রাতের বার্তা।'
গভীর রাতে শেয়ার করা এই ভিডিওটি দ্রুত জেন-জি’র পরিচিত মিম টেমপ্লেটে জায়গা করে নেয় এভাবে : এমন এক আবেগহীন সঙ্গী যে সারাদিন কোনো খোঁজ নেয় না, কিন্তু মাঝরাতের পর ঠিক হাজির হয়। ব্যাপকভাবে শেয়ার হওয়া আরেকটি পোস্টে কেবল লেখা ছিল : 'রাত ১২টায় পুরুষদের অবস্থা।'
তবে নরেন্দ্র মোদির এই জনসংযোগের সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হওয়া অংশটি ছিল তার বারবার 'ফ্রেন্ডস' শব্দটি ব্যবহার করা। পরদিন ভারতের বিভিন্ন শহরের বিক্ষোভে আন্দোলনকারীদের হাতে মোদীর ছবি সংবলিত পোস্টার দেখা যায়, যার নিচে লেখা ছিল- 'ফ্রেন্ডস উইথআউট বেনিফিটস' (স্বার্থহীন বন্ধু)।
যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি অ্যাকশনের ছবির সাথে 'আমি তোমার বন্ধু নই' লেখা আরও হাজার হাজার পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে।
অনেক জেন-জি আন্দোলনকারী নরেন্দ্র মোদির পিআর কৌশলের এই পরিবর্তনটি ধরতে পেরেছিলেন বলে মনে হয়। তারা ভিডিওটিকে এমনভাবে বিশ্লেষণ করছিলেন যেন কোনো ইনফ্লুয়েন্সারের কনটেন্টের রিভিউ দিচ্ছেন!
ইনস্টাগ্রামের বিভিন্ন পোস্টে 'নরেন্দ্র মোদির ভিডিওতে যেসব ভুল ছিল' শিরোনামের তালিকায় শুরুটা আকর্ষণীয় না হওয়া থেকে শুরু করে ভিডিওর দৈর্ঘ্য— সবকিছুরই সমালোচনা করা হয়। যুক্তি দেওয়া হয়, আজকের প্রজন্ম যাদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কম, তাদের জন্য ভিডিওটি বড্ড দীর্ঘ ছিল।
এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক না থাকায় মজা করে মন্তব্য করেন, 'এডিটিং খুবই বাজে হয়েছে। দয়া করে আমাকে হায়ার করুন।'
ভিডিওর কমেন্ট সেকশনটি অনাহূত কনটেন্ট রিভিউয়ের জায়গায় পরিণত হয়। এক ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী ব্যঙ্গ করে লেখেন, 'মোদি জি, আপনি আমার প্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার।' আবার অনেকে তিনি কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার হতে পারেন, সে বিষয়ে হাস্যরসের ছলে নানা পরামর্শও দেন।
বেশ কয়েকজন ব্যবহারকারী দুটি ভিডিওর মধ্যে দ্রুত ঘটে যাওয়া পরিবর্তনও লক্ষ্য করেন। দ্বিতীয়বার আপলোড করা ভিডিওতে ব্যাপক ট্রোল হওয়া সেই ফ্রন্ট-ক্যামেরার ক্লোজ-আপ অ্যাঙ্গেলটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। ফলে এটি নিয়ে নতুন করে কৌতুক তৈরি হয় যে, প্রধানমন্ত্রীর সোশ্যাল মিডিয়া টিম বোধহয় কমেন্ট সেকশন পড়ে উপদেশ নিচ্ছিল!
শনিবার ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পরপরই কংগ্রেসের ওয়ানাড়ের সংসদ সদস্য প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ইনস্টাগ্রামে আরও বন্ধু বানানোর জন্য মানুষকে ধন্যবাদ জানান এবং প্রধানমন্ত্রীকে 'বোকা বোকা ভিডিও না বানিয়ে' শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সাংবাদিকদের বলেন, 'এই সময়ে এটি অত্যন্ত হাস্যকর। একদমই হাস্যকর। সারা ভারতের তরুণ সমাজ রাজপথে নেমে আসার জন্য তিনিই দায়ী। তাদের জঙ্গি মনে করে পেলেট গান দিয়ে গুলি করার পেছনে তিনিই দায়ী।'
হয়তো এটি নিয়ে চলমান বিতর্কের ইতি টানার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই রিলটি শেষ পর্যন্ত পুরো আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার আগেই ইন্টারনেটে জেন-জি-র মিম-ভাবনায় প্রধানমন্ত্রীকে তাদের অনাহুত আগন্তুকের এক চরিত্রে পরিণত করে ফেলেছিল।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক