দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত ভারতের রাম মন্দির
ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় ব্রজেশ কুমার প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিন তলা বেয়ে উঠে নিজের বাড়ির ছাদে একাকী বসেন। সেখান থেকে সরাসরি রাম মন্দির দেখা যায়।
কয়েক দশক ধরে, ৬৫ বছর বয়সী এই প্রবীণ নাগরিক এক সময়ের শান্ত এই শহরটিকে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে দেখেছেন; যার নেতৃত্বে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি। এই শহরেই এখন মন্দিরটি দাঁড়িয়ে আছে, আগে সেখানে ষোড়শ শতকের বাবরি মসজিদ ছিল। কিন্তু ১৯৯২ সালে হিন্দু জনতা সেটি ভেঙে ফেলে, যার ফলে দেশজুড়ে ধর্মীয় দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই ছিল মুসলিম।
আড়াই বছর আগে, হিন্দু দেবতা রামের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত এই নতুন মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অনেক হিন্দুই বিশ্বাস করেন যে, ধার্মিকতার প্রতীক হিসেবে পূজিত দেবতা রাম এখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
জন্মলগ্নের বিতর্ক ও হত্যার ইতিহাস সত্ত্বেও ব্রজেশ কুমারের মতো হিন্দু ভক্তদের কাছে এই মন্দিরটি এক ধরনের মানসিক শান্তি এনে দিয়েছিল। কিন্তু তা কেবল অতি সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।
গত এক মাস ধরে মন্দিরটি এমন কিছু অভিযোগে জড়িয়ে পড়েছে, যেখানে বলা হচ্ছে—যাদের ওপর এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল, তারা ভক্তদের কাছ থেকে আসা লাখ লাখ ডলার মূল্যের অনুদান আত্মসাৎ করেছে।
এ প্রসঙ্গে ব্রজেশ কুমার আল জাজিরাকে বলেন, ‘ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তারা আমাদের বিশ্বাসের ওপর ডাকাতি করেছে, এর কম কিছু নয়। তাদের ওপর ছেড়ে দিলে, তারা একদিন ধর্মের নামে আমাদের সবাইকে বিক্রি করে দেবে এবং নিজেদের পকেট ভারী করবে।’
এই অভিযোগগুলোর জেরে শুরু হয়েছে পুলিশি তদন্ত, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা, যা ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এই রাজ্যের আগামী কয়েক মাস পরের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
অযোধ্যার কেলেঙ্কারি
উদ্বোধনের পর থেকেই রাম মন্দির ভারতের অন্যতম শীর্ষ ধর্মীয় স্থান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে যা লাখ লাখ হিন্দু ভক্তকে আকর্ষণ করছে।
'শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট' নামের একটি স্বাধীন ট্রাস্ট এই উপাসনালয়টি পরিচালনা করে। যদিও এটি সরকারের আওতাধীন নয়, তবে এর নির্বাহী সদস্যরা রাজনৈতিক প্রভাব খাটান এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন 'রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ' (আরএসএস)-এর সাথে যুক্ত, যা বিজেপির আদর্শিক উৎস।
এই মাসের শুরুতে ট্রাস্টের অ্যাকাউন্টিং টিমের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মহিপাল সিং প্রকাশ্যেই অনিয়মের কথা তুলে ধরলে প্রথম দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। আলজাজিরা এ বিষয়ে মন্তব্য নেওয়ার জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।
জনসাধারণের ক্ষোভের পর, বিরোধী সমাজবাদী পার্টির নেতা ও উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব বিষয়টি লুফে নেন এবং অভিযোগ করেন যে লাখ লাখ রুপির অনুদান হারিয়ে গেছে।
ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে বিজেপি শাসিত রাজ্য সরকার তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়, যা ইতোমধ্যেই অনুদান আত্মসাতের অভিযোগের ওপর একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
যদিও প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি, তবুও রাজ্য পুলিশ একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে এবং মন্দিরটিতে নগদ টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী গণনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিসহ অন্তত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
এরপর থেকে আরও অনেক ভক্ত তাদের মূল্যবান সামগ্রীর খোঁজ পেতে এগিয়ে আসছেন, যার মধ্যে রোপ্য ইট, সোনার গহনা এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী রয়েছে, যা তারা ট্রাস্টের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন।
গত শুক্রবার ট্রাস্টের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই অন্যান্য হাই-প্রোফাইল ট্রাস্টিদের সাথে পদত্যাগ করেন। রাম মন্দির আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব চম্পত রাইয়ের জন্য এই অভিযোগগুলো বিশেষভাবে কালিমালিপ্ত করার মতো।
তবে এই পদক্ষেপ রাজ্যে উত্তেজনা প্রশমনে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি, যেখানে বিজেপি সমর্থকসহ হাজার হাজার ভক্ত নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন।
‘রাম মন্দির চালাচ্ছে ধূর্ত চোরেরা’
১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার দায়ে অভিযুক্তদের মধ্যে সন্তোষ দুবেও একজন ছিলেন। তিনি কখনোই নিজের ভূমিকার কথা অস্বীকার করেননি, বরং তা বুক ফুলিয়ে প্রচার করেছেন।
মসজিদ ভাঙার পর, দুবে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন, যেখানে উভয় পক্ষ কয়েক দশক ধরে তীব্র আইনি লড়াই চালিয়েছিল। ২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই স্থানটি হিন্দুদের দিয়ে দেয়—যদিও আদালত মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাটিকে বেআইনি বলে গণ্য করেছিল। সর্বোচ্চ আদালত মুসলমানদের অযোধ্যার বাইরে একটি নতুন মসজিদ তৈরির জন্য জমি দেয়। ২০২০ সালে দুবে এবং মসজিদ ভাঙার দায়ে অভিযুক্ত অন্যদের খালাস দেওয়া হয়। রায়ে আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবের কথা উল্লেখ করেছিল।
সেই রায়গুলো যদি দুবের কাছে আত্মতৃপ্তির কারণ হয়ে থাকে, তবে মন্দিরের এই কথিত আত্মসাতের ঘটনা তাকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
অযোধ্যা থেকে আলজাজিরার সঙ্গে আলাপকালে দুবে বলেন, ‘এই দুর্নীতি আমাকে গভীর মানসিক কষ্ট দিচ্ছে, এমন এক বেদনা যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমি শুধু এটাই বলতে পারি যে, তাদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে কম কোনো শাস্তিই যথেষ্ট নয়।’
সন্তোষ দুবে আরও বলেন, ‘ধূর্ত, অসৎ ও নিষ্ঠুর চোরেরা রাম মন্দির চালাচ্ছে এবং তারা এমন এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে যে কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।’
দুবে বলেন, সরকার ভক্তদের এই ক্ষোভকে সহজে উপেক্ষা করতে পারবে না, কারণ এই ঘটনাটি বিজেপির সেই বয়ানকে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছে যেখানে তারা নিজেদের হিন্দু ধর্মের রক্ষাকর্তা হিসেবে দাবি করে।
এই ট্রাস্টটি বিতর্কের মুখে পড়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০২১ সালেও ট্রাস্টের বিরুদ্ধে জনসাধারণের অনুদান ব্যবহার করে অতিরিক্ত চড়া দামে জমি কেনার অভিযোগ উঠেছিল।
আলজাজিরা যোগাযোগ করলে বিজেপির মুখপাত্ররা সাম্প্রতিক এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
‘আসন্ন নির্বাচনে প্রভাব’
মন্দিরের ভক্ত এবং সরকারের সমালোচকেরা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ তুলছেন।
বিরোধী দলীয় নেতা অখিলেশ যাদব এই মামলাটির ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপকে ‘সন্দেহজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তদন্তে স্বচ্ছতার দাবি জানিয়ে যাদব বলেন, ‘সরকার ক্যাশ গণনাকারী কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে, আর বড় বড় মাছদের আড়াল করছে যারা এই প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের পেছনে কলকাঠি নেড়েছে।’
রাম মন্দির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত প্রখ্যাত হিন্দু সাধু কার্পাত্রী মহারাজ আলজাজিরাকে বলেন, ‘সরকার কনিষ্ঠ কর্মীদের বলির পাঁঠা বানাচ্ছে এবং তাদের গ্রেপ্তার করছে।’
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশের নেতৃত্বে রয়েছেন কট্টরপন্থী হিন্দু সন্ন্যাসী থেকে রাজনৈতিক নেতা বনে যাওয়া যোগী আদিত্যনাথ, যাকে প্রায়শই আরএসএস-নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের মধ্যে নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয়।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে মোদির দল এই রাজ্যে তাদের একটি বড় সমর্থক গোষ্ঠী হারায়, যার ফলে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ব্যর্থ হয় এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে মিত্রদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশীদ কিদওয়াই বলেন, বিজেপির জন্য—যারা দীর্ঘদিন ধরে রাম মন্দির আন্দোলনকে প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে—এই নতুন বিতর্কটি আগামী বছরের শুরুতে নির্ধারিত উত্তর প্রদেশের নির্বাচনের আগে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রশীদ কিদওয়াই আলজাজিরাকে বলেন, ‘যদি আরও বেশি ধর্মীয় নেতা এই বিষয়ে মুখ খোলেন, তবে তা বিজেপির ওপর বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটি এমন কোনো বিষয় নয় যা মানুষ ভুলে যাবে, কারণ এটি বিশ্বাসের প্রশ্ন এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজেও একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি।’
রশীদ কিদওয়াই বলেন, এই ঘটনাটি আরও বড় কিছু শিক্ষা দেয়- ধর্মীয় আবেগ নিয়ে খেলা করা এবং বিভেদ উস্কে দেওয়া একসময় নিজের দিকেই ধেয়ে আসতে পারে। কিদওয়াইয়ের ভাষায়, ‘এত বছর ধরে যা বিজেপিকে সুবিধা দিয়ে এসেছে, তা-ই এখন তাদের বিশাল ক্ষতি করতে পারে।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক