ইরান ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলা, তবে কি যুদ্ধবিরতি শেষ?
এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ঘোষিত একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। লেবানন সংকটকে কেন্দ্র করে ইরান ও ইসরায়েল একে অপরের ওপর সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়েছে, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর উত্তেজনা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয় পক্ষকে অবিলম্বে ‘গুলি চালানো’ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
কীভাবে সংঘাতের সূত্রপাত?
গত ৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে নতুন যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরদিনই রোববার (৭ জুন) ইসরায়েল বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান সরাসরি নিজের ভূখণ্ড থেকে উত্তর ইসরায়েল লক্ষ্য করে প্রায় ৩০টি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী সোমবার (৮ জুন) মধ্য ও পশ্চিম ইরানের তেহরান, তাবরিজ, কারাজ ও ইসফাহানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে রাতভর ব্যাপক বোমা হামলা চালায়। এরপর তেহরানও দ্বিতীয় দফায় পাল্টা হামলা শুরু করে।
এদিকে, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীও সোমবার ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দায় স্বীকার করেছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের আল-খারজ প্রদেশে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকির সতর্কতা জারি করা হলেও, ইরান সেখানে কোনো হামলা চালানোর খবর অস্বীকার করেছে।
ট্রাম্পের অবস্থান
সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে এক পোস্টে বলেন, ‘ইসরায়েল ও ইরানকে অবিলম্বে ‘গুলি চালানো’ বন্ধ করতে হবে।’ এর আগে ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ওয়াশিংটন-তেহরান চুক্তির কাঠামো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে মেনে নিতেই হবে, কারণ ট্রাম্পই ‘সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন’।
ট্রাম্পের সংযম প্রদর্শনের আহ্বান ও স্পষ্ট হুঁশিয়ারিকে তোয়াক্কা না করেই ইসরায়েল ইরানের অভ্যন্তরে হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে এই অঞ্চলে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব ও মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এদিকে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি দাবি করেছেন, ইরান শুধু ইসরায়েল নয়, যুক্তরাষ্ট্রকেও পুড়িয়ে ফেলার লক্ষ্য নিয়েছে।
লেবানন সংকটের সঙ্গে সংযোগ ও সর্বাত্মক যুদ্ধের শঙ্কা
এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের প্রায় দুই হাজার বর্গকিলোমিটার (দেশের মোট ভূখণ্ডের এক-পঞ্চমাংশ) এলাকা দখল করে রেখেছে। মার্চ থেকে এ পর্যন্ত লেবাননে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইরানের নতুন ‘রেড লাইন’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি কেবল একটি নির্দিষ্ট ফ্রন্টে হতে পারে না, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা মানেই সর্বত্র যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন। হিজবুল্লাহর মাধ্যমে না গিয়ে ইরান এবার সরাসরি নিজের মাটি থেকে হামলা চালিয়ে এই হুঁশিয়ারি বাস্তবায়ন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র কি যুদ্ধে জড়াবে?
আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা কম। কারণ ট্রাম্প মনে করেন যুদ্ধ বড় হলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর বড় প্রভাব পড়বে, যা মার্কিন অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি করবে। তবে তেহরানের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু কূটনীতি নয়, সামরিক শক্তির প্রদর্শনই কেবল দর কষাকষির ক্ষমতা তৈরি করে।

নিজস্ব প্রতিবেদক