গাজা দখলের ইসরায়েলি পরিকল্পনা ট্রাম্পের চুক্তিতে নেই : মার্কো রুবিও
গাজা ভূখণ্ডের ৭০ শতাংশ এলাকা নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দেওয়া নির্দেশনার তীব্র বিরোধিতা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট জানিয়েছেন, গাজা দখল করার এই ইসরায়েলি পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের তৈরি করা যুদ্ধ সমাপ্তির শান্তি প্রস্তাবের অংশ নয়।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২ জুন) মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটির’ সামনে স্টেট ডিপার্টমেন্টের বাজেট সংক্রান্ত শুনানিতে অংশ নিয়ে ডেমোক্রেটিক আইনপ্রণেতাদের তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জবাবে রুবিও এই মন্তব্য করেন। খবর আনাদুলুর।
ডেমোক্রেটিক প্রতিনিধি রোসা ডিলরো গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ৭০ শতাংশ অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার নির্দেশনার বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতামত জানতে চান। তখন রুবিও বলেন, আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। আর আমাদের সেই পরিকল্পনায় গাজা দখলের কোনো কথা বলা হয়নি। নেতানিয়াহুর বিবৃতির বিষয়ে বারবার চাপ দেওয়া হলে তিনি আবারও বলেন, তিনি (নেতানিয়াহু) হয়তো এই বক্তব্যটি দিয়েছেন, কিন্তু এটি আমাদের শান্তি পরিকল্পনার অংশ নয়।
শুনানি চলাকালীন ডেমোক্রেটিক প্রতিনিধি ডিলরো ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে গাজা সংকট ভুলে যাওয়া এবং যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষিত ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন। তবে রুবিও এই অভিযোগ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, না, কেউ গাজা সংকট ভুলে যায়নি। কয়েক মাস আগে আমরা গাজায় যে ধরনের সামরিক অভিযান ও যুদ্ধ দেখেছি, এখন হয়তো সেই পরিস্থিতি নেই। তবে এটি এখনও আমাদের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এই সংকট সমাধানে কাজ করে যাচ্ছি।
ট্রাম্পের ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে গাজার নিরাপত্তার জন্য ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’ মোতায়েনের চেষ্টা করছে। তবে এর প্রধান শর্ত হলো হামাসকে অবশ্যই সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণে রাজি হতে হবে।
রুবিও বলেন, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো দেশ বা পক্ষ গাজায় অর্থ বিনিয়োগ করতে চাইবে না, কারণ সবাই জানে যে তা না হলে সেখানে আবারও যুদ্ধ শুরু হবে। আমাদের আঞ্চলিক অংশীদাররাও হামাসকে এই শর্ত মেনে নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর গাজায় আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রায় প্রতিদিনই সেখানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গাজা মিডিয়া অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতি চলার মধ্যেই ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৯৩২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২ হাজার ৮৫৯ জন আহত হয়েছেন। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের দুই বছরব্যাপী ভয়াবহ হামলায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশেরই নারী ও শিশু।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ছিল- হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ করা, গাজা থেকে আংশিক ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, জিম্মি ও বন্দি বিনিময় এবং গাজায় পূর্ণাঙ্গ মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করা। আর দ্বিতীয় ধাপের শর্ত অনুযায়ী, সেখানে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন করা হবে, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ করা হবে, ইসরায়েলি সেনাদের পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে এবং গাজা সাময়িকভাবে পরিচালনার জন্য ফিলিস্তিনিদের নিয়ে ‘টেকনোক্র্যাট’ কমিটি গঠন করা হবে।
তবে গত বৃহস্পতিবার নেতানিয়াহু দাবি করেন, গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ অঞ্চল ইতোমধ্যে ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তারা এটিকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশে নিয়ে যেতে চান। অথচ ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ইসরায়েলি বাহিনী গাজার ৫৩ শতাংশ অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ঘোষণা দিয়ে নির্দিষ্ট সীমারেখায় (ইয়েলো লাইন) পিছিয়ে গিয়েছিল।
শুনানিতে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ক্রমবর্ধমান সহিংসতা এবং ইসরায়েলের ‘কার্যত ভূখণ্ড দখল’ নীতি নিয়েও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে রুবিও জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সবসময়ই পশ্চিম তীরের বর্তমান অবস্থার যেকোনো একতরফা পরিবর্তনের বিরোধিতা করে আসছেন।
রুবিও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্টভাবে এবং বারবার বলেছেন যে তিনি পশ্চিম তীরের স্থিতাবস্থার এই পরিবর্তনের পক্ষে নন। কারণ এটি গাজা সংকট নিয়ে আমাদের শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আমরা আমাদের এই উদ্বেগের কথা ইসরায়েলি পক্ষকেও জানিয়ে দিয়েছি।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক