ইরান যুদ্ধের পরও থামছে না ট্রাম্পের দ্বন্দ্ব, সংকটে মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক
ইরান যুদ্ধ ঘিরে সামরিক উত্তেজনা কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিললেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সম্পর্কের টানাপোড়েন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা, ইউরোপে সামরিক উপস্থিতি কমানোর হুমকি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি হামলার পরও মিত্রদের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের শীতল অবস্থান নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। খবর রয়টার্সের।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্ররা এখন ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর পথ খুঁজছে। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া এই পরিস্থিতিকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের বেপরোয়া আচরণ বৈশ্বিক কূটনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন প্রশ্নের মুখে।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই ইউরোপের সঙ্গে ট্রাম্পের দূরত্ব বাড়তে থাকে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, যদিও এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।
ইরানের পাল্টা পদক্ষেপে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় ইউরোপ বড় ধরনের জ্বালানি সংকটে পড়ে। ফলে এমন এক যুদ্ধে ইউরোপ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যে যুদ্ধে তারা সরাসরি জড়াতে চায়নি।
এরই মধ্যে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, জার্মানিতে অবস্থানরত ৩৬ হাজার ৪০০ মার্কিন সেনার মধ্যে ৫ হাজার সদস্যকে প্রত্যাহার করা হবে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বিব্রত’ করছে- এতে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ট্রাম্প।
পরে পেন্টাগন জার্মানিতে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনাও বাতিল করে দেয়। ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দেন, ইতালি ও স্পেন থেকেও মার্কিন সেনা কমানো হতে পারে।
মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, ন্যাটো মিত্ররা ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট সমর্থন দেয়নি। এমনকি ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ধারা-৫ মানতেও অনাগ্রহী হতে পারে।
এদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে এবং যৌথ অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করতে উদ্যোগী হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ এখন ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছে।
উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গেও ট্রাম্প প্রশাসনের দূরত্ব বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরও ট্রাম্প পরিস্থিতিকে ‘ছোটখাটো ঘটনা’ বলে উড়িয়ে দেন। অথচ হামলায় ফুজাইরাহর গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিশোধনাগার আগুন লাগে এবং স্কুল বন্ধ ঘোষণা করতে হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে সৌদি আরব, আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো আশঙ্কা করছে- যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এমন কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, যা তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে।
এদিকে এশিয়ার মিত্র দেশগুলোও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো মনে করছে, জ্বালানি সংকট ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের কারণে ট্রাম্প ভবিষ্যতে চীনের বিরুদ্ধে সংঘাতে সরাসরি জড়াতে অনাগ্রহী হতে পারেন।
জাপানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকেশি ইওয়ায়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও প্রত্যাশা কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পুরো অঞ্চলের ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলতে পারে।
অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পশ্চিমাদের মনোযোগ সরে যাওয়ায় রাশিয়া লাভবান হচ্ছে। একইসঙ্গে চীনও দেখছে, কীভাবে কম খরচের ড্রোন ও অসম যুদ্ধকৌশল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকেও চাপে ফেলতে পারে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা ভিক্টোরিয়া কোটস মনে করেন, চীনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্ব অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে তুলে ধরা সহজ হবে না, কারণ বেইজিং নিজেও ইরানকে পুরোপুরি সহায়তা করেনি।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক