কেন ইরানের জন্য স্বর্ণ দান করছেন কাশ্মীরিরা, ভাঙছেন মাটির ব্যাংক?
ভারত শাসিত কাশ্মীরের শ্রীনগর থেকে বুদগাম উপত্যকাজুড়ে এখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। যুদ্ধের কবলে থাকা ইরানের সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বিলিয়ে দিচ্ছেন কাশ্মীরিরা। কেউ বিয়ের জন্য জমানো স্বর্ণের গয়না দিচ্ছেন, কেউ ভাঙছেন তিল তিল করে জমানো মাটির ব্যাংক, আবার কেউ দান করছেন নিজের জীবিকার একমাত্র বাহনটি। এক হাজার ৬০০ কিলোমিটার দূরের এক জনগোষ্ঠীর প্রতি এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা নজর কেড়েছে বিশ্ববাসীর। খবর আল জাজিরার।
গত ২১ মার্চ যখন পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছিল, তখন কাশ্মীরের বুদগামের ৫৫ বছর বয়সী মাসরাত মুখতার উৎসবের বদলে বেছে নিলেন ত্যাগের পথ। জন্মদিনে বাবার দেওয়া প্রিয় স্বর্ণের কানের দুল জোড়া তিনি তুলে দিলেন ইরান ত্রাণ তহবিলে। মাসরাত বলেন, ‘আমরা যা ভালোবাসি, তাই দিই। এটি আমাদের তাদের আরও কাছে নিয়ে আসে। ‘ছোট ইরান’ (কাশ্মীরের ঐতিহাসিক নাম) তার নামের প্রতি বিশ্বস্তদের জন্য এটাই করে।’
শ্রীনগরের শিয়া-প্রধান এলাকা জাদিবালে দেখা গেছে অন্যরকম দৃশ্য। ৭৩ বছর বয়সী তাহেরা জান জানান, কাশ্মীরি মায়েরা তাদের মেয়েদের বিয়ের জন্য পরম যত্নে তামা ও পিতলের বাসনপত্র জমিয়ে রাখেন। সেই মূল্যবান সামগ্রীগুলো তারা দান করে দিচ্ছেন ইরানের সেইসব মেয়েদের জন্য, যারা মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় তাদের পরিবার হারিয়েছে।
সাদাকাত আলী মীর নামে এক তরুণ ট্রাক চালক তার উপার্জনের দুটি গাড়ির একটি দান করে দিয়েছেন। ৯ বছরের শিশু জয়নাব জান তার কয়েক বছরের জমানো মাটির ব্যাংকটি তুলে দিয়েছে স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে। এমনকি অনেক সুন্নি পরিবারও সাদামাটাভাবে ঈদ পালন করে তাদের বেঁচে যাওয়া অর্থ ইরানের জন্য পাঠিয়েছে।
কাশ্মীর ও ইরানের এই বন্ধন আজ নতুন নয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে পারস্যের সুফি সাধক মীর সাইয়্যেদ আলী হামদানি ইরান থেকে কাশ্মীরে এসে ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি পারস্যের শিল্পকলা ও সাহিত্যের প্রসার ঘটিয়েছিলেন। এই গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণেই কাশ্মীরকে ঐতিহাসিকভাবে ‘ইরান-ই-সগির’ বা ‘ছোট ইরান’ বলা হয়।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, কাশ্মীর থেকে এ পর্যন্ত সংগৃহীত নগদ টাকা, স্বর্ণ, গয়না ও যানবাহনের মোট মূল্য প্রায় ছয় বিলিয়ন রুপি (ছয় কোটি ৪০ লাখ ডলার) ছাড়িয়েছে। ভারত থেকে ইরানে যাওয়া মোট অনুদানের প্রায় ৪০ শতাংশই এসেছে এই উপত্যকা থেকে। নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস এই মানবিক সহায়তার জন্য কাশ্মীরি জনগণের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
এদিকে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ ও রাজ্য তদন্ত সংস্থা (এসআইএ) জানিয়েছে, যাচাই না করে সরাসরি দালালের মাধ্যমে তহবিল জমা দিলে তা বিপথে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ও সংগৃহীত অর্থ যেন কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে না পড়ে, সেজন্য সরাসরি দূতাবাসে অনুদান জমা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
পাকিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ কোনো সমঝোতা ছাড়াই ভেস্তে যাওয়ায় পরিস্থিতি এখন আরও জটিল। আগামী বুধবার (২২ এপ্রিল) বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। দুই হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটা এই যুদ্ধে ইরান এখন চরম মানবিক সংকটে, আর সেই সংকটেই পরম বন্ধুর মতো হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ‘ছোট ইরান’ খ্যাত কাশ্মীর।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক