ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি না হলেও যুদ্ধবিরতি ‘আপাতত’ বহাল থাকছে
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এ ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলটির মানুষ এখনো ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি টিকে থাকার আশায় বুক বেঁধেছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দুই পক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক শেষে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তান ছেড়ে গেছেন। যাওয়ার সময় তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটন তেহরানের সামনে চুক্তির জন্য তাদের ‘চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব’ পেশ করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে একটি অত্যন্ত সহজ প্রস্তাব রেখে যাচ্ছি। এখন দেখার বিষয় ইরানিরা এটি গ্রহণ করে কি না।’
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, আলোচনায় তার প্রতিনিধিদল গঠনমূলক প্রস্তাব পেশ করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপর পক্ষ (যুক্তরাষ্ট্র) আলোচনার এই পর্বে ইরানি প্রতিনিধি দলের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
আলোচনার এই ব্যর্থতা নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে যে, যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ও তেল-গ্যাস স্থাপনাগুলো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় রোববার (১২ এপ্রিল) জানিয়েছে, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া তাদের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনটি পুনরায় চালু করা হয়েছে। এছাড়া কাতারের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ওপর থেকে কিছু বিধিনিষেধ তুলে নিচ্ছে।
এই আলোচনার আয়োজন করেছিল পাকিস্তান এবং বিবদমান দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলেও এনেছিল দেশটি। পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা সংলাপের এই ধারা অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে দেশটি উভয় পক্ষকে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলা এখন একান্ত অপরিহার্য।
ইউরেনিয়াম মজুত
মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'অ্যাক্সিওস' নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মতবিরোধের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ইরানের দাবি এবং তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানানোর বিষয়টি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়, যার জবাবে তেহরানের পাল্টা আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয় এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দেয়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এই আলোচনায় নিজ নিজ অবস্থানে অনড় ছিল। ওয়াশিংটন এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে মাইন পরিষ্কারকারী জাহাজ পাঠানোর কথা বলে ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়েছিল।
আলোচনার সময় উত্তেজনার লক্ষণ প্রকাশ পায় যখন ইরানি গণমাধ্যমগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে যে, ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি নিয়ে ‘বেশি দাবি’ করছে। যুদ্ধের কারণে ইরান এটি কার্যত বন্ধ করার আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হতো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও শনিবার আলোচনার কয়েক ঘণ্টার মাথায় দাবি করেছিলেন যে, ইরানি নেতাদের হত্যা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে জয়ী হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছলাম কি না তা আমার কাছে আলাদাভাবে কিছু প্রমাণ করে না। কারণ আমরাই জয়ী হয়েছি।
প্রভাব বিস্তারের কৌশল
ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টা ধরে চলা এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উভয় পক্ষের মধ্যে চরম অবিশ্বাস দেখা গেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যখন ট্রাম্পের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী বন্ধু স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে আলোচনার মাঝপথে ছিল, তখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালায়। কুশনার ও উইটকফ দুজনেই পাকিস্তানে ভ্যান্সের প্রতিনিধি দলের অংশ ছিলেন।
যুদ্ধের প্রথম দিকের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। যুদ্ধ অবসানের চুক্তির ক্ষেত্রে ইরানের দাবির মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা সম্পদ অবমুক্ত করা এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি যুদ্ধের অবসান ঘটানো। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়াও ছিল একটি বড় বিতর্কের বিষয়।
পুরো যুদ্ধ চলাকালীন ইরান এই সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ হাতে রেখে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে, যার ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়ায় ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী শনিবার জানায়, তাদের দুটি যুদ্ধজাহাজ মাইন পরিষ্কার করতে এবং ট্যাঙ্কারের জন্য নিরাপদ পথ নিশ্চিত করতে প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে ইরানি সামরিক বাহিনী কোনো মার্কিন জাহাজ প্রবেশের কথা অস্বীকার করেছে এবং প্রবেশ করলে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ কমান্ড জানিয়েছে, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে নিরাপদ যাতায়াতের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা কেবল নির্দিষ্ট শর্তে বেসামরিক জাহাজের জন্য প্রযোজ্য।
লেবাননে সহিংসতা
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ইসরায়েলের দাবি। সেটি হলো যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর রকেট হামলার জবাবে ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে বিমান হামলা ও স্থল অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
লেবানন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার দেশটির দক্ষিণে ইসরায়েলি হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছে। এর ফলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি অভিযানে দেশটিতে নিহতের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে গেল।
আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবানন আলাদাভাবে আলোচনায় বসবে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শনিবার বলেছেন, তিনি লেবাননের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি চান যা ‘প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকবে।’ তবে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা বৈরুতের কেন্দ্রীয় সরকারকে চাপে ফেলার কৌশল অবলম্বন করবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক