ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটে থাকা ইরানে এখনো অনিশ্চয়তা
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের মুখে নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের (যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা) এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ইরানের ৯ কোটি জনসংখ্যার বড় একটি অংশ এখনো বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গত ডিসেম্বরে শুরু হওয়া সরকার বিরোধী বিক্ষোভ বেশ দ্রুতই প্রাণঘাতী রূপ নেয়।
গত ৮ জানুয়ারি রাতে ইরান সরকার হঠাৎ করেই দেশটির ৩১টি প্রদেশে সব ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। তখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে তেহরানের দোকানদারদের ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া অসন্তোষ বিশাল সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছিল। ওই রাতে মোবাইল ফোনের যোগাযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, এমনকি জরুরি উদ্ধারকারী সংস্থাকেও ফোন করতে পারেনি সাধারণ মানুষ। খবর আলজাজিরার।
ব্ল্যাকআউট শুরুর কয়েক দিন পর কর্তৃপক্ষ কেবল স্থানীয় ওয়েবসাইট ও পরিষেবা ব্যবহারের জন্য একটি 'ইন্ট্রানেট' ব্যবস্থা চালু করে। তবে, বৈশ্বিক ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার কবে নাগাদ বা কতটুকু ফিরবে, তা এখনো অস্পষ্ট। স্থানীয় ফোন কল সেবা চালু হলেও এসএমএস (টেক্সট মেসেজ) সেবা এখনো বন্ধ রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার থেকে কেবল দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক কল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র প্রতিদিন দেশের মানুষকে একতরফাভাবে অসংখ্য খুদে বার্তা পাঠিয়ে চলেছে, যেখানে তাদের "শত্রু"দের ষড়যন্ত্রের শিকার না হতে এবং যেকোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপের কথা কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হচ্ছে।
বিদেশি ‘চক্রের’ ওপর দায় চাপানো
বিক্ষোভকারী ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে (যা মূলত ৮ ও ৯ জানুয়ারি রাতে ঘটেছিল) কতজন নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে সরকার এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। মার্কিন ভিত্তিক 'হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি' (এইচআরএএনএ) বুধবার পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ২,৬১৫ বলে দাবি করেছে, যদিও ইরান সরকার একে অতিরঞ্জিত বলছে।
চলতি সপ্তাহে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে দাবি করেন। মৃতের সংখ্যার বিষয়ে আরাঘচি বলেন, ‘আমি অবশ্যই এই সংখ্যা ও পরিসংখ্যান অস্বীকার করছি। এটি একটি অতিরঞ্জিত এবং ভুল তথ্যের প্রচারণা, যার উদ্দেশ্য হলো ইরানের বিরুদ্ধে আরও আগ্রাসন চালানোর অজুহাত খোঁজা।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই সংঘাতে জড়ানোর লক্ষ্যেই এই সংখ্যা বাড়িয়ে বলা হচ্ছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে যে নিহতদের মধ্যে শিশু, নারী ও নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিক রয়েছে। তবে কর্মকর্তাদের দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্রদের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত ও সশস্ত্র ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘চক্র’ এই গণহত্যাকাণ্ড এবং দাঙ্গার পেছনে দায়ী। এই দাঙ্গায় সরকারি ভবন ও জনসম্পদ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা উল্টো দাবি করেছেন যে, ইরানি বাহিনীর সদস্যদেরও হত্যা করা হয়েছে, এমনকি কাউকে পুড়িয়ে বা শিরশ্ছেদ করে মারা হয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে আল জাজিরা স্বাধীনভাবে নিহতের এই সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগে ইরানি কর্তৃপক্ষ নিহতের ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। তারা বলছে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে এই দেশগুলো মূলত ‘হাইজ্যাক’ করেছে। জাতিসংঘ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা না করার ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে, ট্রাম্প ইরান আক্রমণ করতে পারেন—এমন আশঙ্কার মধ্যে কোনো ধরনের সশস্ত্র হস্তক্ষেপের বিরোধিতাও করেছে সংস্থাটি।
দাঙ্গাকারীদের জন্য ‘কোনো করুণা নেই’
প্রাণঘাতী বিক্ষোভের পর তেহরানসহ অন্যান্য শহরের রাস্তাঘাট এখন তুলনামূলক শান্ত। তবে সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়ে অনেকের মনেই আতঙ্ক রয়েছে। রাস্তায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং অসংখ্য চেকপোস্ট ও সশস্ত্র টহল বসানো হয়েছে।
গত কয়েক দিনে সরকার দেশজুড়ে বিশাল পাল্টা-বিক্ষোভের আয়োজন করেছে এবং নিহত নিরাপত্তা কর্মীদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এই সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের ‘ইরানের প্রকৃত জনগণ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ঘোষণা করেন, সরকারি সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা বিদেশি শত্রুদের সেই চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়েছে যা স্থানীয় ভাড়াটেদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার কথা ছিল।
দেশটির বিচার বিভাগ আদালত গঠন করেছে এবং বিক্ষোভ-সংক্রান্ত মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, ‘দাঙ্গাকারীদের’ প্রতি কোনো করুণা দেখানো হবে না।
কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বিক্ষোভ
বুধবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান যে, তিনি আশ্বাস পেয়েছেন ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে না। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও বিদেশি গণমাধ্যমের সেই খবরগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে, যেখানে বলা হয়েছিল যে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় এক যুবককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং শীঘ্রই তার ফাঁসি হতে পারে।
বিক্ষোভের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া চলতি সপ্তাহের প্রথম ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মূলত ‘সন্ত্রাসীদের’ নিন্দা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তবে পুরো দেশ যে একটি রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটের কবলে রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো উচ্চবাচ্য করেননি।
মুদ্রাস্ফীতির কারণে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকায় পেজেশকিয়ান প্রশাসন মাসিক জনপ্রতি ৭ ডলারের কম মূল্যের ইলেকট্রনিক কুপন চালু করেছে, যা দিয়ে চার মাস পর্যন্ত সরকারি ভর্তুকিমূল্যে নিত্যপণ্য কেনা যাবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানে বিক্ষোভ এবারই প্রথম নয়। মানুষ দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক কষ্ট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং সামাজিক স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার বিষয়ে ক্ষুব্ধ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে মাহসা আমিনি নামে এক তরুণী সঠিকভাবে হিজাব না পরার অভিযোগে তেহরানে গ্রেপ্তার হন। হেফাজতে থাকাকালীন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে হাসপাতালে মারা যান। তার মৃত্যুতে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, যা কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়। এসময় ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ স্লোগানটি বেশ জনপ্রিয় হয়। তখন ২০০ জন নিহত এবং ৫,৫০০ জন গ্রেপ্তার হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল।
তবে ডিসেম্বরে তেহরানের কয়েকজন দোকানদারের হাত ধরে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভের ঢেউ বিগত কয়েক বছরের মধ্যে বৃহত্তম এবং নিশ্চিতভাবেই সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক