সাইবার সুরক্ষা, নাকি কণ্ঠরোধ-আইন সংশোধন নিয়ে নাগরিক সংলাপে উদ্বেগ
সাইবার সুরক্ষা আইন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, নাকি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করছে-এ প্রশ্নে রাজধানীতে নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনের অষ্টম তলায় এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
‘সাইবার সুরক্ষা, না কণ্ঠরোধ? কার স্বার্থে মতপ্রকাশের নতুন সীমা নির্ধারণ ও আইন সংশোধন’ শীর্ষক এ সংলাপের আয়োজন করে ভয়েস ফর রিফর্ম, নাগরিক কোয়ালিশন, এইচআরএসএস, জেআরএ, ডিএসএ ভিকটিম অ্যালায়েন্স ও বাংলাদেশ আমেরিকা অ্যালায়েন্স।
বিশিষ্ট আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলমের সভাপতিত্বে সংলাপে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
সংলাপে শহিদুল আলম বলেন, জনগণের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে তারা প্রস্তুত। বিএনপিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আপনাদেরকে বিএনপিকরণ থেকে রক্ষা করার জন্যই আমরা জনগণের পক্ষ থেকে লড়াই করছি।’
রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও দলীয় আধিপত্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশের ব্যবস্থাগত সংকট কীভাবে তৈরি হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের বোঝা প্রয়োজন। আমরা জনগণের পক্ষে। জনগণের অধিকারের জন্য যা দরকার, যখন দরকার এবং যেভাবে দরকার-আমরা তা করব। অতীতে ‘বিএনপিকরণ’-এর চরিত্র দেশের মানুষ দেখেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, কোনো ভাবেই সাইবার বা মানহানির আইনের কারণে সাংবাদিকদের বা কোনো নাগরিকের জেল হওয়ার পক্ষে নন। তবে একটি নিয়মতান্ত্রিক দেওয়ানি বা সিভিল পেনাল্টি (আর্থিক জরিমানা) থাকা উচিত।
প্রেস কাউন্সিলের বর্তমান কাঠামোকে অপ্রতুল আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি আইনি সত্য ও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষার কাঠামো দরকার, যাতে কোনো বড় পুঁজিপতি নিউজপেপার বা মিডিয়ার আড়ালে নিজের ব্যবসার স্বার্থহানি ঠেকাতে অন্য কারও বিরুদ্ধে দিনরাত অপপ্রচার চালাতে না পারে। কোনো সরকারের পরিবর্তন হলে যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপতথ্য ছড়ানো বা বন্ধ করার নোংরা খেলা বন্ধ হয়।’
সাইবার সুরক্ষা আইনসহ বিভিন্ন বিতর্কিত আইন প্রণয়নের সমালোচনা করেন এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তাঁর অভিযোগ, সরকার নিজের অপকর্ম আড়াল করা ও ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে এসব আইন করেছে।
তিনি বলেন, সংস্কারের নামে সরকারের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে যেসব আইনি ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা ছিল, ক্ষমতায় আসার পর সেগুলো একে একে বাতিল বা দুর্বল করা হয়েছে।
আখতার হোসেনের ভাষ্য, সংবিধানে জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য থাকা গণভোটের ব্যবস্থা বাতিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিচার বিভাগ, উচ্চ আদালতের নিয়োগপ্রক্রিয়া ও মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করারও অভিযোগ করেন তিনি।
সাইবার সুরক্ষা আইন প্রসঙ্গে আখতার হোসেন বলেন, 'এটি সাইবার সুরক্ষা নয়, বরং সরকার নিজের সুরক্ষা ও নিজের অপকর্ম ঢাকতেই এই আইন তৈরি করেছে।'
ময়মনসিংহের সাথি আক্তার নামে এক নারীর গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নাগরিকরা নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সরকারের সমালোচনা করলেও তাঁদের এ আইনের আওতায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, আইনের বিভিন্ন ধারা জনগণের স্বার্থের বিপরীতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সংলাপটি সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর। বক্তারা সাইবার সুরক্ষা-সংক্রান্ত আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন মানবাধিকারকর্মী ও গুম কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, অল্টারনেটিভের সংগঠক ডা. তাজনুভা জাবীন, সাংবাদিক রাজীব আহমেদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের দিদার ভূঁইয়া, এনসিপির সারোয়ার তুষার, নাগরিক কোয়ালিশনের হাসিব উদ্দিন হোসেন এবং এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজ ইসলাম।
আলোচনায় সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অপতথ্য মোকাবিলা এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয় উঠে এসেছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক