যুদ্ধের স্মৃতি থেকে ফুটবলের মহারণে
ফুটবলের মাঠে বাঁশি বাজবে। বল গড়াবে। গ্যালারিতে উন্মাদনার ঢেউ উঠবে। কিন্তু কিছু লড়াইয়ের গল্প শুধু ৯০ মিনিটে আটকে থাকে না। সেখানে মিশে থাকে শত বছরের ইতিহাস, যুদ্ধের ক্ষত, মিত্রতার স্মৃতি আর জাতীয় গর্বের অদৃশ্য ঝাঁজ।
স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মতো দল যখন মুখোমুখি হয়, তখন একদিকে থাকে ট্রফির স্বপ্ন, অন্যদিকে জেগে ওঠে ইতিহাসের পুরোনো অধ্যায়। সবুজ গালিচায় তাই ফুটবলের আড়ালে জেগে ওঠে শত বছরের প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প।
ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হলে সবার আগে মনে পড়ে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের কথা। দক্ষিণ আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে শুরু হওয়া সেই সংঘাত ৭৪ দিন ধরে কাঁপিয়ে দিয়েছিল দুই দেশকে। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বাহিনীর বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
তবে সেই লড়াইয়ে ফ্রান্সের ভূমিকাও ছিল আলোচনার বিষয়। সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও আর্জেন্টিনার ব্যবহৃত ফরাসি প্রযুক্তির অস্ত্র সম্পর্কে তথ্য দিয়ে ব্রিটেনকে সহযোগিতা করেছিল তারা।
ফ্রান্স ও স্পেনের সম্পর্কের পাতায়ও রয়েছে সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস। ১৮০৭ থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত চলা পেনিনসুলার যুদ্ধ ছিল ইউরোপের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়া এক অধ্যায়। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের শক্তিশালী ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে স্পেন। সেই যুদ্ধে স্পেনের পাশে দাঁড়ায় ইংল্যান্ড। ব্রিটিশ সেনাপতি আর্থার ওয়েলেসলির নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী ধীরে ধীরে ফরাসি আধিপত্য ভেঙে দেয়। যা শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইউরোপের ইতিহাসে এক দীর্ঘ উপাখ্যান। শত শত বছর ধরে দুই দেশ কখনো সরাসরি, কখনো মিত্রদের মাধ্যমে একে অপরের বিপক্ষে লড়েছে। এর মধ্যে ১৮১৫ সালের ওয়াটারলু যুদ্ধ বিশেষভাবে স্মরণীয়। ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনীর কাছে নেপোলিয়নের পরাজয় শুধু একটি যুদ্ধের ফল ছিল না। এটি বদলে দিয়েছিল ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রও।
আর্জেন্টিনার ইতিহাসে স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে আছে ১৮১০ সালের মে বিপ্লব। স্পেনের উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বুয়েনস এইরেসে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ধীরে ধীরে স্বাধীনতার পথ তৈরি করে। কয়েক বছরের সংগ্রামের পর ১৮১৬ সালে আর্জেন্টিনা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সেই স্বাধীনতার চেতনা আজও দেশটির ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
অন্যদিকে, ইংল্যান্ড ও স্পেনের সম্পর্ক ছিল আধিপত্যের লড়াইয়ে ভরা। ১৬ শতকের শেষ দিকে শুরু হওয়া অ্যাংলো স্প্যানিশ যুদ্ধগুলো ছিল সমুদ্র, বাণিজ্য ও উপনিবেশ নিয়ন্ত্রণের সংঘাত। ১৫৮৮ সালে স্প্যানিশ আর্মাডার পরাজয় ইংল্যান্ডকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী নৌ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে দেয়।
সময় বদলেছে, বদলেছে লড়াইয়ের ধরন। এখন আর যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যের সারি দেখা যায় না। শোনা যায় না অস্ত্রের শব্দ। সেই উত্তাপ এখন ছড়িয়ে পড়ে ফুটবল মাঠে। স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড কিংবা আর্জেন্টিনার জার্সিতে আজ লড়াই হয় গোলের জন্য। কিন্তু সেই লড়াইয়ের আবেগের গভীরে থেকে যায় শত বছরের ইতিহাস। তাই তাদের মুখোমুখি হওয়া মানেই ফুটবলের মোড়কে ফিরে আসা ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।

স্পোর্টস ডেস্ক