হলান্ডের পায়ের ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া নরওয়ে
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত ছবিটা প্রায় একই রকম। অল্প বয়সেই প্রতিভা বাছাই, ব্যয়বহুল একাডেমি, প্রতিদিনের কঠোর অনুশীলন, অসংখ্য প্রতিযোগিতা আর সেরাদের টিকে থাকার লড়াই। ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার পরাশক্তিরা বছরের পর বছর এই পথেই বিশ্বজয়ের গল্প লিখেছে। কিন্তু উত্তর ইউরোপের ছোট্ট দেশ নরওয়ে যেন ফুটবলকে দেখেছে অন্য চোখে।
নরওয়েতে শিশুকে শুরুতেই জিততে শেখানো হয় না। শেখানো হয় খেলাটিকে ভালোবাসতে। ছোটবেলা স্কোরলাইন নয়, গুরুত্ব পায় মাঠে কাটানো সময়, আনন্দ আর অংশগ্রহণ। সেই দর্শনের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক আজকের আর্লিং হলান্ড। তিনি শুধু গোল করেই বিশ্বকে মুগ্ধ করছেন না, ফুটবলার তৈরির প্রচলিত ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছেন।
মাত্র ৫৬ লাখ মানুষের দেশ নরওয়ে। ফুটবল ইতিহাসে তাদের নাম কখনো ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা ফ্রান্সের পাশে উচ্চারিত হয়নি। ১৯৯৮ সালের পর টানা ২৮ বছর বিশ্বকাপের মূল পর্বেই জায়গা পায়নি তারা। এবারের আসর তাদের ইতিহাসের মাত্র চতুর্থ বিশ্বকাপ। তাই মূল পর্বে ওঠাই ছিল বড় অর্জন। অথচ সেই দলই এখন বিশ্বের সেরা আট দলের একটি। শেষ ষোলোতে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে। এই সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ধৈর্য আর ভিন্ন এক ক্রীড়া দর্শনের ফসল।
এই যাত্রার সবচেয়ে আলোচিত নাম আর্লিং হলান্ড। কয়েক বছর আগেও বিশ্বকাপে তাকে দেখার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন অনেক ফুটবলপ্রেমী। ক্লাব ফুটবলে একের পর এক গোল করলেও জাতীয় দল বিশ্বকাপে জায়গা পাচ্ছিল না।
২০২২ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে মাত্র ২৪টি বুন্দেসলিগা ম্যাচে ২২ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি। চোটের কারণে ১৬টি ম্যাচ খেলতে পারেননি। তারপরও ইউরোপের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকারদের একজন ছিলেন। কিন্তু নরওয়ে বিশ্বকাপে না থাকায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তার সামর্থ্য দেখার সুযোগ হয়নি।
চার বছর পর সেই আক্ষেপ ঘুচেছে ইতিহাস হয়ে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে টানা আট ম্যাচ জিতে নরওয়ে করেছে ৩৭ গোল। অন্য যেকোনো দলের চেয়ে আট গোল বেশি। সেই দুর্দান্ত আক্রমণভাগের নেতৃত্বে ছিলেন হলান্ড। মূল পর্বেও একই ধারাবাহিকতা। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত নরওয়ের ১২ গোলের মধ্যে সাতটিই এসেছে তার পা থেকে। মাত্র ১৮টি শট নিয়ে সাত গোল। স্ট্রাইকার হিসেবে কার্যকারিতার এমন পরিসংখ্যান বিশ্বকাপে খুব কমই দেখা যায়। ৩৬০ মিনিট খেলেই তিনি গোলদাতাদের তালিকার শীর্ষ সারিতে উঠে এসেছেন।
তবে নরওয়ের সাফল্যকে শুধু হলান্ডের গোলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। মার্টিন ওডেগার্ডের দূরদৃষ্টি, আন্তোনিও নুসার গতি, আলেক্সান্ডার সোরলোথের শারীরিক শক্তি, জুলিয়ান রাইয়ারসনের নিরলস পরিশ্রম মিলিয়ে দলটি হয়ে উঠেছে অসাধারণ ভারসাম্যপূর্ণ। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে দলগত সমন্বয়ই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
মাঠের বাইরেও নরওয়ে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত নাম। সমর্থকদের ভাইকিং রো উদযাপন ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপের নতুন প্রতীকে পরিণত হয়েছে। গ্যালারি থেকে সেই উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। সংসদ ভবন, হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম, স্কুল, রাস্তাঘাট– সবখানেই একই আবহ। ফুটবল সেখানে শুধু একটি খেলা নয়, জাতীয় আনন্দের উৎসবে রূপ নিয়েছে।
এই সাফল্যের শিকড় খুঁজতে হলে ফিরতে হবে নরওয়ের তৃণমূল ক্রীড়া ব্যবস্থায়। বিশ্বের অনেক দেশে শিশুরা খুব ছোট বয়স থেকেই প্রতিযোগিতার চাপে পড়ে। ভালো খেলতে না পারলে দল থেকে বাদ পড়তে হয়, স্বপ্ন ভেঙে যায় শুরুতেই। নরওয়ে সেই পথ বেছে নেয়নি।
দেশটির ফুটবল নীতিতে ১৩ বছর বয়সের আগে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতার ফল সংরক্ষণ করা হয় না। ছয় বছর বয়স থেকে সবাই সমান সুযোগে খেলতে পারে। কে কত গোল করল কিংবা কে জিতল, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সবাই যেন খেলতে পারে এবং খেলার আনন্দ উপভোগ করে।
এই নীতির বাস্তব প্রয়োগও অত্যন্ত পরিকল্পিত। ছয় ও সাত বছর বয়সীরা তিনজনের দলে খেলে, যাতে প্রত্যেকে বেশি সময় বলের সংস্পর্শে থাকতে পারে। আট ও নয় বছর বয়সে শুরু হয় পাঁচজনের ফুটবল। তখন জোর দেওয়া হয় পাসিং, বল নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা গড়ে তোলার ওপর। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিযোগিতাও বাড়ে, কিন্তু আনন্দ কখনো হারিয়ে যায় না।
হলান্ড নিজেই এই দর্শনের বাস্তব উদাহরণ। পাঁচ কিংবা ছয় বছর বয়সে ব্রিনে এফকেতে ফুটবল শুরু করলেও তিনি কেবল ফুটবলেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। হ্যান্ডবল খেলেছেন, অ্যাথলেটিক্সেও অংশ নিয়েছেন। তার বাবা আলফি হলান্ড পেশাদার ফুটবলার হলেও ছেলেকে এক খেলায় আটকে রাখেননি। নরওয়ের বিশ্বাস, বিভিন্ন খেলায় অংশ নেওয়া শিশুর শরীর, মস্তিষ্ক এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আরও ভালোভাবে গড়ে তোলে।
এই দর্শন বাস্তবায়নে নরওয়ে শুধু নীতিগত সিদ্ধান্তেই থেমে থাকেনি। ২০১১ সাল থেকে প্রায় ১৭ হাজার কোচ তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছেন। তাদের মধ্যে প্রায় দুই হাজার উয়েফা বি ডিপ্লোমাধারী। প্রতিটি বয়সভিত্তিক পর্যায়ের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
আরও একটি জায়গায় নরওয়ে আলাদা। ইউরোপের অনেক দেশের মতো সেখানে বিশাল একাডেমি সংস্কৃতি নেই। স্থানীয় ক্লাবগুলোর বড় অংশ পরিচালনা করেন স্বেচ্ছাসেবী অভিভাবকেরা। ফুটবল সেখানে শুধু পেশা নয়, সামাজিক বন্ধনেরও অংশ। ফলে একজন শিশুর কাছে খেলা মানে চাপ নয়, আনন্দ।
বিশ্ব ফুটবলের প্রচলিত ধারণা বলে, বড় সাফল্য পেতে হলে ছোটবেলা থেকেই নির্মম প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। নরওয়ে সেই ধারণার সামনে নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা ফ্রান্স যেখানে কঠোর একাডেমি ব্যবস্থায় বিশ্বজয়ের পথ তৈরি করেছে। সেখানে নরওয়ে দেখাচ্ছে অংশগ্রহণভিত্তিক ব্যবস্থাও সমান কার্যকর হতে পারে।
আজ নরওয়ের জার্সি বাজারে পাওয়া কঠিন। রাজধানী অসলো উৎসবের শহরে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞাপন, দোকানের শোকেস, রাস্তার বিলবোর্ড, সবখানেই হলান্ডের মুখ। তিনি শুধু একজন গোলদাতা নন, একটি দর্শনের প্রতীক। এমন এক দর্শন, যা মনে করিয়ে দেয় সবচেয়ে বড় প্রতিভা জন্ম নেয় শুধু কঠোর অনুশীলনে নয়, খেলাটিকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসার মধ্যেও।
হয়তো এবারের বিশ্বকাপের ট্রফি শেষ পর্যন্ত নরওয়ের হাতে উঠবে, হয়তো উঠবে না। কিন্তু একটি বিষয় ইতোমধ্যেই স্পষ্ট– আর্লিং হলান্ড শুধু গোল করছেন না, তিনি বিশ্ব ফুটবলকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছেন। আর তার দেশ নরওয়ে প্রমাণ করছে, প্রতিভা তৈরির সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি অনেক সময় প্রতিযোগিতা নয়, আনন্দও হতে পারে।

স্পোর্টস ডেস্ক