পবিত্র লাইলাতুল বরাত
গুরুত্ব ও তাৎপর্য
শবেবরাত এক পুণ্যময় রজনী। হিজরি বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শাবানের ১৫তম রাত শবেবরাত নামে আমাদের সমাজে পরিচিত। ‘শব’ আর ‘বরাত’ দুটি শব্দ যোগে রাতটির নামকরণ। শবেবরাত নামকরণ ফার্সি ভাষা অনুকরণে হয়েছে। ‘শব’ শব্দটির অর্থ রাত আর ‘বরাত’ অর্থ ভাগ্য। শবেবরাতের অর্থ ভাগ্যরজনী। এই পুণ্যময় রজনীতে সমগ্র সৃষ্টির আগামী এক বছরের হায়াত, মউত, রিজিক, দৌলত লিপিবদ্ধ হয় এমন বিশ্বাসের ভিত্তিতে উপরোক্ত নামকরণ হয়েছে। রাতটির আরবি নামকরণে বলা হয় ‘লাইলাতুল বারাত’। তবে এ নাম কোনো আরবি পণ্ডিতের দেওয়া নয়, বরং ভারত উপমহাদেশীয় শবেবরাতেরই আরবি অনুবাদ। আরবি ভাষাতে লাইলাতুন অর্থ রাত। আর বারাত অর্থ মুক্তি। অতএব, লাইলাতুল বারাত এর অর্থ মুক্তির রাত। এ রাতের ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে মহান আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্য লাভ এবং গুনাহ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি অর্জন করা যায় এমন বিশ্বাস থেকেই এর নামকরণ লাইলাতুল বারাত করা হয়েছে।
গুরুত্ব
মানবজীবনে কোনো কিছুর গুরুত্ব নির্ধারিত হয় তার ফলাফল বা লাভ-লোকসানের ওপর ভিত্তি করে। আর মুমিন বান্দার জীবনে লাভ বলতে পরকালীন জীবনের প্রাপ্তিকেই বিশেষভাবে বোঝায়। আর ক্ষতি বলতে পরকালীন জীবনের বঞ্ছনাকেই বোঝায়। সুতরাং মুমিন ব্যক্তি যে কাজের মাধ্যমে পরকালে জান্নাত লাভ করতে পারে আর জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে পারে, সেটাই তার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ দৃষ্টিকোণ থেকে মুমিন-মুসলমানের জীবনে শবেবরাতের গুরুত্ব সীমাহীন। কারণ, এ রাতের ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একান্ত সান্নিধ্য লাভ করতে পারে এবং জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে। হজরত আয়েশা (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহর (সা.)-কে খুঁজতে বের হলাম। জান্নাতুল বাকিতে (মদিনার সর্ববৃহৎ কবরস্থান) গিয়ে তাঁকে পেলাম। তিনি আকাশপানে মাথা উঁচু করে ছিলেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি ভেবেছ, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল তোমার ওপর জুলুম করবেন? হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি বললাম, তেমন কিছু নয়। আমি ভেবেছিলাম, আপনি হয়তো আপনার অন্য কোনো স্ত্রীর নিকট গমন করেছেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহতায়ালা নিসফে শাবানের রাতে (শবেবরাতে) সৃষ্টির প্রতি করুণার দৃষ্টি দেন এবং কালব গোত্রের বকরির পশমের চেয়েও অধিক মানুষকে ক্ষমা করে দেন। (সুনানে ইবনে মাযা, হাদিস : ১৩৮৯)
তাৎপর্য
শবেবরাতের রাতটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ফজিলতপূর্ণ এ রাতে মহান আল্লাহ বান্দার গুনাহ ক্ষমা করেন ঠিকই, কিন্তু নিঃশর্তভাবে নয়। মহান আল্লাহর ক্ষমা পেতে তাকে পাশবিক গুণ বর্জন ও ইমানের দাবি পূরণ করতে হবে। হজরত আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা শাবান মাসের মধ্য রজনীতে (শবেবরাতে) সৃষ্টির প্রতি করুণার দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক আর হিংসুক ছাড়া সকলকে ক্ষমা করে দেন। (সুনানে ইবনে মাযা, হাদিস : ১৩৯০)
সুতরাং শবেবরাতের মহৎ রজনীতে সকল মুমিন মুসলমানকে নিজ আত্মার সমস্ত খেদ ঝেড়ে ফেলে দিয়ে একনিষ্ঠভাবে মহান আল্লাহর ইবাদত করতে হবে।
লেখক : পেশ ইমাম ও খতিব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।

মোহাম্মদ মাকছুদ উল্লাহ