প্লাস্টিক বর্জ্য পৃথকীকরণে যুক্ত তিন জেলার পাঁচ ক্যাম্পাস
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের দূষণ কমাতে উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণের চর্চা গড়ে তুলতে টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় রিসাইক্লারের সঙ্গে যুক্ত করেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশ।
এক মাসব্যাপী এ ক্যাম্পেইনে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ৭৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারী অংশ নেন। কর্মসূচির আওতায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্জ্য পৃথকীকরণের বিন সরবরাহের পাশাপাশি পৃথক করা প্লাস্টিক সংগ্রহের জন্য স্থানীয় রিসাইক্লিং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা হয়েছে।
‘প্লাস্টিকস সার্কুলারিটি প্রজেক্ট’-এর আওতায় ক্যাম্পেইনটি বাস্তবায়ন করা হয়। দ্য কোকা-কোলা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় ইউএনডিপি বাংলাদেশ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের স্থানীয় উন্নয়ন সহযোগী ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা)।
৩১ আগস্ট টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় এবং ১ সেপ্টেম্বর মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পেইনের কার্যক্রম শুরু হয়। দুই দিনে দুই প্রতিষ্ঠানে ৩০০ জনের বেশি অংশ নেন।
এরপর ৭ ও ৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের কদম মোবারক সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয় এবং সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেখানে অংশ নেন ২৯৫ জনের বেশি। ২৮ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার কমার্স কলেজে কর্মসূচির সমাপনী পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন ১৩৫ জনের বেশি।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ১২০ লিটার ধারণক্ষমতার বর্জ্য পৃথকীকরণ বিন দেওয়া হয়েছে। বাংলায় লেখা লেবেলসহ এসব বিনে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্যের জন্য আলাদা রং ব্যবহার করা হয়েছে।
ক্যাম্পেইনের বিশেষত্ব ছিল শুধু সচেতনতা তৈরিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বর্জ্য সংগ্রহের পরবর্তী ধাপের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা। প্রতিটি ক্যাম্পাসকে একজন নির্দিষ্ট স্থানীয় রিসাইক্লিং উদ্যোক্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পৃথক করা প্লাস্টিক সংগ্রহ করবেন।
ক্যাম্পেইনের প্রতিটি সেশনে উৎসে বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে প্লাস্টিক কীভাবে পুনরুদ্ধার শৃঙ্খলে প্রবেশ করে, তা তুলে ধরা হয়। স্থানীয় স্ক্র্যাপ ও ভাঙারি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পৃথক করা প্লাস্টিক কীভাবে পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে যায়, সে বিষয়েও আলোচনা করা হয়।
সেশনগুলোতে ‘৪আর’ কাঠামো-রিডিউস, রিইউজ, রিকভার ও রিসাইকেল—নিয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা তুলে ধরা হয়।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ৮০ মিনিটের কর্মসূচিতে ছিল ইন্টারঅ্যাকটিভ উপস্থাপনা, হাতে-কলমে বর্জ্য পৃথকীকরণ খেলা, ‘র্যাপিড ফায়ার’ কুইজ, স্থানীয় রিসাইক্লারের উপস্থিতিতে বিন হস্তান্তর এবং সমবেত পরিবেশ শপথ। কুইজের বিজয়ীদের প্লাস্টিকের ট্রফির পরিবর্তে মাটির টবে গাছ দেওয়া হয়।
ক্যাম্পেইনে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রশাসনের কাছে শ্রেণিকক্ষ ও ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পৃথক বিন রাখা, প্রতিষ্ঠানের প্লাস্টিক বর্জ্য অন্যান্য বর্জ্যের সঙ্গে না মিশিয়ে সংগ্রহকারীদের হাতে তুলে দেওয়া এবং সপ্তাহে একদিন পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পরিচালনার অঙ্গীকার চাওয়া হয়।
কদম মোবারক সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক টিংকু কুমার ভৌমিক বলেন, 'প্লাস্টিক এখন আমাদের জন্য রীতিমতো আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—আমরা না জেনেই প্লাস্টিক খাচ্ছি। বিদ্যালয় শুধু গণিত বা ইংরেজি পড়ার জায়গা নয়; যে বিষয়গুলোতে সচেতনতা দরকার, সেগুলোও এখানেই শিখতে হবে। আজ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আমরা শিক্ষকেরাও শিখছি।'
কক্সবাজার কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ মো. জসীম উদ্দিন বলেন, প্লাস্টিকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ শুরু করতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই এবং তাঁর কলেজ থেকেই এর শুরু হওয়া উচিত।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাহমুদা বিনতে লতিফ বলেন, বিনগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা করা হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগকেও এ উদ্যোগে যুক্ত হতে উৎসাহিত করা হবে।
বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাফাজ্জল হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শ্রেণিকে যুক্ত করে এ ধরনের কর্মসূচি প্রতি মাসে আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আয়োজকেরা জানান, সচেতনতার পাশাপাশি বাস্তব ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা তৈরি করাই এ ক্যাম্পেইনের অন্যতম লক্ষ্য। এ কারণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বিন দেওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট রিসাইক্লিং উদ্যোক্তার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা হয়েছে, যাতে পৃথক করা প্লাস্টিক নিয়মিত সংগ্রহ করে পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে পাঠানো যায়।
ক্যাম্পেইনের পর পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে সংগৃহীত প্লাস্টিকের পরিমাণ নিয়মিত রেকর্ড করা হবে। এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যার পাশাপাশি ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে কত পরিমাণ প্লাস্টিক পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তারও হিসাব রাখা হবে।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টাঙ্গাইল জেলায় প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে ‘প্লাস্টিকস সার্কুলারিটি প্রজেক্ট’-এর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক