অসময়ে ভোক্তার চাহিদা মেটাচ্ছে কাটিমন আম, ফলন ও দামে খুশি কৃষক
আম উৎপাদনে অন্যতম জেলা নওগাঁয় আম্রপালি, নাক ফজলি, গোপালভোগ, হিমসাগরসহ বিভিন্ন পরিচিত জাতের মৌসুমি আম অনেক আগেই বেচাকেনা শেষ হয়েছে। ভোক্তারা চাইলেও এ বছর আর খেতে পারবে না ওসব আম। তারপরও নওগাঁর বাজার ধরে রেখেছে ‘কাটিমন’ জাতের আম। বর্তমানে জেলার সাপাহারে এই আমের বাজার পথচারীদের নজর কাড়ছে, চাহিদা মেটাচ্ছে ভোক্তাদের।
এখন আর মাস ভেদে নিয়ম করে আম পাকে না। গত ৫ বছর থেকে প্রায় প্রতি মাসেই আম পাওয়া যাচ্ছে। হাড়িভাঙ্গা, আম্রপালিসহ বিভিন্ন জাতের আমের বাজার শেষ হলেও এখন বাজারে রাজত্ব করছে বারোমাসি কাটিমন জাতের আম। দেখতে ভালো হওয়ায় খুব সহজেই নজর কাড়ছে পথচারীদের। বৈশাখ পেরিয়ে ভাদ্র মাসও শেষের দিকে, আশ্বিন শেষ হয়ে অগ্রহায়ণেও হয়তোবা থাকবে নওগাঁর বাজারে এই আমের সরবরাহ ও রাজত্ব।
আমের দুটো সিজন থাকে, ‘অন সিজন’ ও ‘অফ সিজন’। বছরের শুরুতে শীর্ষে থাকে আম্রপালি। পর্যায়ক্রমে নাকফজলি, হিমসাগর, হাঁড়িভাঙা, গোবিন্দভোগ, ল্যাংড়া ও গোপালভোগসহ অন্যান্য জাতের আম পাওয়া যায় অন সিজনে। এরপর আর ভোক্তাদের ভাগ্যে জোটে না আম। তবে গত ২০২১ সাল থেকে ‘অফ সিজনের’ কাটিমন জাতের আমের উৎপাদন ও ফলন বাড়তে থাকে। নজরে আসে ক্রেতাদের, চাহিদা বাড়তে থাকে ভোক্তাদের।
মূলত সারা বছর চাষ করা যায় বলে এটি বারোমাসি আম নামেই পরিচিত। আমটি দেখতে যেমন ভালো, খেতেও ভালো। আর এই কারণে অফ সিজনেও নওগাঁসহ দেশ ও বিদেশে অবস্থানরত ভোক্তাদের চাহিদা মেটাচ্ছে আলাদা স্বাদের কাটিমন জাতের এই আম। এই আম সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে জেলার সাপাহার উপজেলায়। সেই জন্য দেশ-বিদেশে সুখ্যাতি আছে সাপাহারের আম ও আমের বাজারের।
নওগাঁর সবচেয়ে আমের বড় বাজার জেলার সাপাহার উপজেলায় বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার (১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা তাদের আম ভ্যানে করে নিয়ে এসেছে। সারি সারি করে দাঁড়িয়ে আছে বিক্রির জন্য। অফ সিজনে আমের এই বাজার দেখে হতবাক ও আনন্দিত উপজেলাবাসী। কারণ তারা গত বছরও এই সময়ে এই রকম আমের বাজার কখনও দেখেনি। তাদের দাবি, আমের এই বাজার দেখে যে কেউ ভাববে পুরো আমের সিজন চলছে। কারণ অনেক সময় সিজনেও এই রকম আমের বাজার থাকে।
সাপাহার বাজারে আম বিক্রি করতে এসেছেন উপজেলার হরিপুরের আমচাষি মনসুর আলী। তিনি বলেন, আমি ৫ বিঘা জমিতে কাটিমন আম চাষ করেছি, ফলন অনেক ভালো হয়েছে। দাম চেয়েছি ৮ হাজার টাকা মন, আর ব্যাপারী সাড়ে ৬ হাজার বলেছে। তবে ৭ হাজার টাকা হলে বিক্রি করব। এছাড়া আমের প্রকারভেদে দাম কম বা আরও বেশি হতে পারে।
তার মতো উপজেলার বালুকাডাঙ্গার আম চাষি রেজাউল ও সিদ্দিকুর রহমান জানান, এ সময় অন্যান্য আম না থাকায় কাটিমন আমের ব্যাপক চাহিদা। এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলনও বেশ হয়েছে। আগামীতে এর তিন গুণ আম চাষ হবে বলে আশা করছি।
ঘুরতে এসে বাড়ির জন্য কাটিমন আম কিনলেন উপজেলার প্রদীপ নামের এক ভোক্তা। তিনি বলেন, আগে কখনও এই আমের এতো বাজার দেখিনি। এখনতো আম নেই, চোখের সামনে এতো সুন্দর আম দেখে এমনিতেই কিনতে ইচ্ছে করে। তাই মাঝে মাঝে কিনে বাড়িতে নিয়ে যাই।
তার মতো বাড়ির জন্য আম কিনলেন নয়ন ও সিরাজ নামের দুই ক্রেতা। তারা জানালেন, আজ আমের বাজার দেখে আমরা হতবাক। মনে হচ্ছে আমের সিজনের সময়ের বাজার। আর কাটিমন আমগুলো দেখতে খুব ভালো লাগছে। যেহেতু পরিবারের সদস্যরা আম পছন্দ করে। তাই কিনে নিলাম।
উপজেলার গোয়ালা ইউনিয়নের সারোগডাঙ্গা এলাকার আমচাষি হাফিজুর রহমান বলেন, আমি ১৬ বিঘা জমিতে কাটিমন জাতের আম চাষ করেছি। প্রতিমণ আম বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার টাকা করে। এখনও মুকুল আছে, এই আম কমপক্ষে নভেম্বর ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। মোট কথা সারা বছর এই আম পাওয়া যাবে।
হাফিজুর রহমান আরও বলেন, আমি ২০১৯ সালে কাটিমন জাতের এই আম চাষের উদ্যোগ নিই। একটি অনুপ্রেরণামূলক ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এই আম চাষ শুরু করি। ২০২১ সাল থেকে আম ধরা শুরু করে। এছাড়া বারোমাসি এই আম চাষের ফলে আমার বাগানে অন্তত ১০-১২ জন কর্ম করতে পারে। অন্যান্য আম খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়, ফলে তাদের কাজ আর থাকে না। তাই আমার এখানে সারা বছর তারা কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে।
একইভাবে ২০১৯ সালে কাটিমন জাতের গাছের চারা লাগিয়েছিলেন বলে জানালেন একই ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর এলাকার আমচাষি নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, আমি ইউটিউব দেখে অনুপ্রাণিত হই। এরপর সফলতা আসে ২০২১ সালে। এটা মোটামুটি লাভজনক। তবে খুব পরিশ্রম আছে, আবার উৎপাদন খরচও আছে। আমি গত বছর ১৫ বিঘা জমিতে চাষ করেছিলাম। এই বছর ৩৭ বিঘা জমিতে কাটিমন জাতের আম চাষ করেছি। আমার এখানে ৯ জন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। তবে আমার এই আম এক-দুই মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। বাজারে প্রকারভেদে দাম ৬ হাজার ৩০০ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত।
সাপাহার উপজেলার টেংরা কুড়ি গ্রামের কৃষক জামাল উদ্দিন ৬০ বিঘা জমিতে কাটিমন আমের বাগান করেছেন। তিনি বলেন, প্রতি বিঘাতে ২০ থেকে ২৫ মন আবার কখনও ৩০ থেকে ৩৫ মন আমের ফলন হয়। এ সময় বাজারে অন্য আম না থাকায় কাটিমন আমের রাজত্ব চলছে। মণ প্রতি ৪ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বাজার চলছে। এবারে বাগান থেকে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার আম বিক্রি হবে বলে আশা করছি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর ও সমর সাহা জানান, এর আগে কাটিমন আমের এরকম জাঁকজমক বেচাকেনা দেখা যায়নি। এবারে ব্যাপক আমের আমদানি হয়েছে। অনেক কৃষক বলছেন, আগামীতে তারা আরও এই আম চাষ করবেন। এই আম শুরুতেই অনেক দাম পাওয়া যায়। কারণ বাজারে অন্যান্য আম নাই এবং হয়রানি ও ঝামেলা কম।
এদিকে জেলার পোরশা, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে কাটিমন জাতের আম চাষ হচ্ছে বলে জানালেন স্ব স্ব উপজেলা কৃষি অফিসার।
সাপাহার উপজেলা কৃষি অফিসার শাপলা খাতুন বলেন, এই উপজেলায় বর্তমানে ১৫০ হেক্টর জমিতে কাটিমন আম চাষ হচ্ছে। যা আগে ছিল ৯৭ হেক্টর। চাষিরা ভালো দাম পাওয়ায় দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে এই জাতের আম চাষে। এছাড়া এই আম সারা বছর পাওয়া যায়। তার জন্য ইচ্ছে করলেই সহজে খেতে পারেন ভোক্তারা। সেই জন্য আমচাষিদের কৃষি বিভাগ থেকে সকল ধরনের সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অদিপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক রেজাউল করিম বলেন, কাটিমন জাতের আম সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে সাপাহার উপজেলায়। এছাড়া জেলার পোরশা, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা, রাণীনগরসহ অন্যান্য উপজেলা মিলে জেলায় এবছর বেড়ে ২৫৫ হেক্টর জমিতে কাটিমন আম চাষ হচ্ছে। যা গত বছর ১৯০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছিল। চাষিদের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই যেকোনো ফসলের উৎপাদনে আগ্রহ বাড়ানো যায়।
রেজাউল করিম আরও বলেন, অন্যান্য জাতের আম একটা নির্দিষ্ট সিজনে হারভেস্ট করা যায় অর্থাৎ পরিপক্ক হয়। কিন্তু কাটিমন জাতের এই আমের বিশেষত্ব হলো কৃষক তার ইচ্ছে অনুযায়ী বছরে ২ থেকে ৩ বার যেকোনো সময়ে হারভেস্ট করতে বা পাকাতে পারে। আর এই কারণেই এই আমের গুরুত্ব আছে। তবে অন্যান্য আমের স্বাদ থেকে এই আমের স্বাদ একটু আলাদা। আর এই আম নওগাঁ থেকে দেশের বিভিন্ন সুপার সপসহ বিদেশে যাচ্ছে।
অতিরিক্ত উপপরিচালক রেজাউল করিম বলেন, এই মৌসুমে কাটিমন আমের ফলন হেক্টর প্রতি ১২ থেকে ১৫ টন। তাতে ২৫৫ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩ হাজার ৬০ থেকে ৩ হাজার ৮২৫ মেট্রিক টন আম পাওয়ার টার্গেট ধরা হয়েছে। প্রতি কেজি আমের সর্বনিম্ন মূল্য ১৫০ টাকা, গড় মূল্য ১৮০ এবং সর্বোচ্চ মূল্য ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে দাম ভালো হওয়ায় ৫৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। কাজেই অফ সিজনেও আমের ফলন ও দাম ভালো পাওয়ায় কাটিমন আম চাষে কৃষকরা দিন দিন আগ্রহী হচ্ছে এবং চাষ বাড়ছে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অদিপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, কাটিমন জাতের এই আমটা সারামাস চাষ করতে পারে আমচাষিরা ও লাভও ভালো পায়। চাষীদের সকল বিষয়ে সহযোগিতাসহ পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখা হয়েছে কৃষি বিভাগ থেকে। চাষিদের উৎসাহ দেখে গতবারের চেয়ে এবার বেশি কাটিমন জাতের আম চাষ হয়েছে। এছাড়া এই জেলায় মোট আমের বাগান আছে ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর।
তবে নির্ধারিত সময় আসার অনেক আগেই বাজার দখল করে নেয় গুটিসহ বিভিন্ন জাতের আম। জুন মাসেই শেষ হয়ে যায় সুস্বাদু আমের বড় বড় বাজার। এমনকি শেষ পর্যায়ে আমের বাজার হয়ে উঠে আকাশচুম্বী, এর মধ্যে নাগালের বাইরে চলে যায় আম্রপালি আমের দাম। সর্বশেষ আশ্বিনা, বারি-৪ আম বাজারে উঠেছিল নওগাঁর বাজারে।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ