জন্মদিনে গ্রন্থোৎসবে কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকার : ‘লেখকের জীবন পাথর ঠেলে পাহাড়চূড়ায় তোলার মতো’
বরিষ ধরা মাঝে শান্তিরও বারী... কিরণ সংস্কৃতি সদনের একদল খুদে শিল্পীর কণ্ঠে যখন ঝরছিল রবীন্দ্রসংগীত, তখন বাইরের মেঘ-মন্দ্র আকাশ থেকেও ঝরছিল ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। বৃষ্টি-বাদল উপেক্ষা করেই সাহিত্যামোদী অনুরাগীরা ভিড় জমান রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মিলনায়তনে। সম্প্রতি কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকারের ৭৩তম জন্মবর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই আনন্দ আয়োজন ও গ্রন্থোৎসবের আয়োজন করে সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনুপ্রাণন প্রকাশন।
অনুষ্ঠানে মঞ্জু সরকারের নতুন উপন্যাস ‘নিয়ন্ত্রক’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘শখের বাগানে সাপ’-এর পাঠোন্মোচন করা হয়। একই সঙ্গে অনুপ্রাণন থেকে প্রকাশিত তাঁর অন্যান্য বইয়ের প্রদর্শনী ও বিক্রি চলে। অনুষ্ঠানের শুরুতে কবি সদ্য সমুজ্জ্বল লেখকের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন।
স্বাগত বক্তব্যে অনুপ্রাণন প্রকাশন-সম্পাদক আবু মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে মঞ্জু সরকারের অবদান অপরিসীম। তরুণদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ ও নান্দনিক রুচি তৈরিতে অনুপ্রাণন সবসময় কাজ করে যাচ্ছে। গুণী এই লেখকের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা সভা ও মূল্যায়ন গ্রন্থ প্রকাশের সূচনা করতে পেরে আয়োজকেরা গর্বিত।
এরপর মঞ্জু সরকারের সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন দেশের বরেণ্য লেখক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক নাসিমা আনিস বলেন, মঞ্জু সরকার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কথাশিল্পী, যার লেখায় সমাজের গভীর বিশ্লেষণ, রাজনীতি, পারিবারিক সম্পর্ক ও ভণ্ডামির চিত্র নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে।
প্রাবন্ধিক চৌধুরী মুফাদ আহমদ বলেন, লেখকের ‘নিয়ন্ত্রক’ উপন্যাসে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত এক মানুষের মনোজগতের মাধ্যমে সমাজ ও পরিবারের স্বার্থের দ্বন্দ্ব দারুণভাবে প্রকাশ পেয়েছে। নাট্যকার ও চলচ্চিত্রকার গিয়াসউদ্দিন সেলিম উল্লেখ করেন, মঞ্জু সরকার তাঁর কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধকে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন, যদিও তিনি বড় মাপের লেখক হয়েও নিভৃতচারী হওয়ায় প্রাপ্য পরিচিতি পাননি। লেখক ও শিক্ষাবিদ খালিকুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর শক্তিশালী লেখনী ও অনন্য রসবোধের প্রশংসা করে মওলানা ভাসানীকে নিয়ে একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস রচনার দাবি জানান। আর লেখক ও গবেষক মফিদুল হক তাঁকে প্রান্তিক ও অন্ত্যজ মানুষের জীবনের একজন অসাধারণ কথাকার হিসেবে আখ্যা দেন।
আলোচনা শেষে আবেগময় প্রতিক্রিয়ায় কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি লেখক হবেন। কিন্তু লেখক পরিচয়ে বেঁচে থাকা এক কঠিন সংগ্রামের বিষয়। পৌরাণিক চরিত্র সিসিফাসের পাথর ঠেলে পাহাড়চূড়ায় তোলার মতোই লেখকের জীবন। একটি বই ব্যর্থ হলেও আবার চেষ্টা করতে হয় এবং এই চেষ্টার মধ্যেই লেখকের পরম আনন্দ ও ভালোবাসা নিহিত। এ সময় তিনি মওলানা ভাসানীকে নিয়ে তাঁর নির্মাণাধীন উপন্যাসের কাজ খুব শীঘ্রই শেষ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের সম্পাদনায় মঞ্জু সরকারের সাহিত্যকর্মের ওপর একটি মূল্যায়নধর্মী গ্রন্থ প্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরিশেষে অতিথিবৃন্দ ও শিশুশিল্পীদের হাতে উপহারসামগ্রী, সম্মাননা স্মারক এবং মঞ্জু সরকারের ফ্রেমবন্দি প্রতিকৃতি তুলে দেওয়া হয়। পুরো অনুষ্ঠানটির প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় ছিলেন কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক